বিশ্বব্যাংক জানুয়ারি সংস্করণে প্রকাশিত গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টাসে বাংলাদেশের বর্তমান অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) বৃদ্ধির হার ৪.৬ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। একই প্রতিবেদনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই হার ৬.১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিশ্বব্যাংক উল্লেখ করেছে ভোক্তা ব্যয়ের বৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতি চাপের হ্রাস। এছাড়া ২০২৬ সালের শুরুর দিকে জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ায় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। নতুন সরকার কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করলে শিল্পখাতের উৎপাদনশীলতা বাড়বে বলে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
এই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সরকারী ব্যয় এবং বেসরকারি বিনিয়োগের উভয় ক্ষেত্রেই বৃদ্ধির সম্ভাবনা নির্দেশ করে। তবে বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে যে, বর্তমান মুদ্রাস্ফীতি লক্ষ্য থেকে বেশি এবং তা নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর মুদ্রানীতি প্রয়োগ করেছে।
অধিকন্তু, দেশের ঋণ প্রবাহের হ্রাস ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক নীতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে, যা রপ্তানি-নির্ভর খাতের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে, বিশ্বব্যাংক ভুটানকে ৭.৩ শতাংশের সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি হার দিয়ে চিহ্নিত করেছে। ভারতের প্রবৃদ্ধি ৫.৫ শতাংশ, শ্রীলঙ্কা ৩.৫ শতাংশ, নেপাল ২.১ শতাংশ এবং মালদ্বীপ ৩.৯ শতাংশ হিসেবে অনুমান করা হয়েছে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের জন্য কোনো পূর্বাভাস প্রকাশ করা হয়নি।
বাংলাদেশের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রথম প্রান্তিকে জিডিপি বৃদ্ধি ৪.৫ শতাংশ রেকর্ড করেছে। একই সময়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই হার ২.৫৮ শতাংশ ছিল, যা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি নির্দেশ করে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে, বিশ্বব্যাংকের উচ্চতর প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারে। ঋণ প্রবাহের সংকোচন সত্ত্বেও, সরকারি ব্যয় এবং অবকাঠামো প্রকল্পে তহবিলের প্রবাহ বাড়লে নির্মাণ, রেলওয়ে, শক্তি ও টেলিকম সেক্টরে নতুন চুক্তি ও কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
অন্যদিকে, মুদ্রাস্ফীতি লক্ষ্য অতিক্রমের ফলে ভোক্তা মূল্যবৃদ্ধি বজায় থাকলে খুচরা বিক্রয় ও সেবা খাতে চাপ বাড়তে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নীতি সুদের হার বাড়িয়ে ঋণগ্রহীতাদের ঋণ গ্রহণের ইচ্ছা কমিয়ে দিতে পারে, যা উৎপাদন খাতের সম্প্রসারণকে ধীর করতে পারে।
বহিরাগত ঝুঁকি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের অস্থিরতা উল্লেখযোগ্য। রপ্তানি-নির্ভর গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল শিল্পে শুল্ক বাড়লে রপ্তানি আয় কমে যাবে, ফলে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহে প্রভাব পড়বে।
অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারকদের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হল মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সঙ্গে ক্রেডিট প্রবাহ বাড়িয়ে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা। কাঠামোগত সংস্কার, বিশেষ করে কর ব্যবস্থার সরলীকরণ এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন, দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে সহায়ক হবে।
সংক্ষেপে, বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪.৬ শতাংশ এবং পরের বছরে ৬.১ শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধি প্রত্যাশা করা হচ্ছে, যা দেশের অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি উজ্জ্বল করে তুলেছে। তবে মুদ্রাস্ফীতি, ক্রেডিট সংকোচন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ঝুঁকি মোকাবেলায় সঠিক নীতি সমন্বয় প্রয়োজন।



