চীন ২০২৫ সালের বাণিজ্য পরিসংখ্যান প্রকাশ করে বিশ্বে সর্বোচ্চ বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অর্জনের কথা জানায়। বেইজিং বুধবার জানিয়েছে যে, পণ্য ও সেবার রপ্তানি-আমদানি পার্থক্য $১.১৯ ট্রিলিয়ন (প্রায় £৮৯০ বিলিয়ন) এ পৌঁছেছে, যা প্রথমবারের মতো এক বছরের মোট উদ্বৃত্ত $১ ট্রিলিয়ন অতিক্রম করেছে। ২০২৪ সালে রেকর্ড $৯৯৩ বিলিয়ন থেকে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বছরের মধ্যে চীনের মাসিক রপ্তানি উদ্বৃত্ত $১০০ বিলিয়ন অতিক্রমের ঘটনা সাতবার রেকর্ড করা হয়েছে। এটি নির্দেশ করে যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতি ও বাণিজ্য নীতি সত্ত্বেও চীনের সামগ্রিক বাণিজ্য প্রবাহে বড় কোনো বাধা সৃষ্টি হয়নি। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য কিছুটা হ্রাস পেয়েছে, তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকায় রপ্তানি বৃদ্ধি এই ঘাটতি পূরণ করেছে।
চীনের কাস্টমসের উপ-পরিচালক ওয়াং জুন বুধবারের প্রেস কনফারেন্সে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান পরিসংখ্যান “অসাধারণ এবং কঠোর পরিশ্রমের ফল” এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের “গভীর পরিবর্তন” ও চ্যালেঞ্জের মধ্যে অর্জিত। তিনি সবুজ প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সম্পর্কিত পণ্য এবং রোবোটিক্সের রপ্তানিতে উত্থানকে বিশেষভাবে তুলে ধরেন। এই সেক্টরগুলোতে চীনের প্রতিযোগিতা বাড়ার ফলে উচ্চ মানের পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে স্বীকৃতি পাচ্ছে।
বৃহৎ উদ্বৃত্তের পেছনে মূল কারণ হিসেবে চীনের পণ্যগুলোর বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধি উল্লেখ করা হয়। দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি দেশীয় বাজারের দুর্বলতা এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করেছে। চীনের রিয়েল এস্টেট সংকট ও ঋণবৃদ্ধি ব্যবসায়িক বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে, ফলে ভোক্তারা ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে। ফলে আমদানি চাহিদা হ্রাস পেয়ে মাত্র ০.৫% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা রপ্তানির তুলনায় নগণ্য।
মুদ্রা দিক থেকে দুর্বল ইউয়ান, পণ্যের সরবরাহের অতিরিক্ততা এবং পশ্চিমা দেশগুলোর মুদ্রাস্ফীতি চীনের রপ্তানিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এই পরিবেশে চীনের পণ্যগুলো সাশ্রয়ী মূল্যে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে পারছে, যা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে তার অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে।
বাণিজ্য নীতি বিশ্লেষক ডেবোরা এল্মস, হিনরিচ ফাউন্ডেশনের সদস্য, এই ফলাফলকে “দ্বৈত আশীর্বাদ” হিসেবে মূল্যায়ন করেন। একদিকে চীনের রপ্তানি বৃদ্ধি ও বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে চীনের পণ্যের ওপর বাড়তি নজরদারি ও প্রতিযোগিতার চাপ বাড়তে পারে। তিনি উল্লেখ করেন যে, ভবিষ্যতে চীনকে গুণগত মান বজায় রেখে মূল্য প্রতিযোগিতা বজায় রাখতে হবে, নতুবা রপ্তানি বাজারে নতুন বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন যে, চীন যদি সবুজ প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পণ্যের রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে বাড়িয়ে রাখতে পারে, তবে তার বাণিজ্য উদ্বৃত্তের গতি স্থিতিশীল থাকবে। তবে রিয়েল এস্টেট খাতের পুনরুদ্ধার ধীর হলে এবং ঋণ সমস্যার সমাধান না হলে দেশীয় চাহিদা আরও হ্রাস পেতে পারে, যা আমদানি পরিমাণকে কমিয়ে উদ্বৃত্তকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নীতিগত পরিবর্তন, বিশেষত বাণিজ্য রোধমূলক পদক্ষেপ, চীনের রপ্তানির ওপর চাপ বাড়াতে পারে।
সারসংক্ষেপে, চীনের ২০২৫ সালের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রেকর্ড তার অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন ও বৈশ্বিক বাজারের চাহিদা সমন্বয়ের ফল। শুল্কের প্রভাব সীমিত হলেও, ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক নিয়মাবলী, মুদ্রা নীতি এবং দেশীয় আর্থিক স্থিতিশীলতা চীনের বাণিজ্য দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



