একটি অজানা জাতের কুকুর, প্রায় চার বছর বয়সের, ১০০ দিনের দীর্ঘ পদযাত্রায় বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের সঙ্গে চলেছে। ভারতের এক গ্রামাঞ্চলে পায়ে হেঁটে শান্তি প্রচারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা সন্ন্যাসীরা, অপ্রত্যাশিতভাবে এই কুকুরকে সঙ্গী হিসেবে পেয়েছেন। কুকুরটি কোনো মালিকের অধীনে না থেকে, নিজের ইচ্ছায় দলটির সঙ্গে মিলিয়ে চলেছে। এই অনন্য সঙ্গতি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
কুকুরটির জাত সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট রেকর্ড নেই, তবে বেশিরভাগের ধারণা এটি ভারতীয় পারিয়া কুকুরের একটি প্রজাতি। এই জাতের নামের অর্থ সংস্কৃতিতে “দিভ্য আলো”। কুকুরটির জন্মের সুনির্দিষ্ট তারিখ অজানা, কোনো জন্মনথি বা প্রাথমিক ছবি পাওয়া যায় না। তার বয়সের অনুমান চার বছর, যা তার শারীরিক গঠন ও আচরণ থেকে নির্ধারিত।
শহরের রাস্তায় বেঁচে থাকা অগণিত কুকুরের মতোই, আলোকা প্রাথমিকভাবে নিজের বেঁচে থাকার জন্য স্বাভাবিক প্রবৃত্তি ও ভাগ্যের ওপর নির্ভর করত। কোনো সুরক্ষিত আশ্রয় বা নিয়মিত খাবার না থাকায়, সে রাস্তায় ঘুরে বেড়াত এবং কখনও কখনও মানুষের কাছ থেকে সাময়িক খাবার পেত। তবে তার জীবনযাত্রা একদিন বদলে যায়, যখন তিনি পায়ে হেঁটে শান্তি প্রচারের যাত্রা শুরু করা সন্ন্যাসীদের সঙ্গে দেখা করেন।
সন্ন্যাসীরা যখন তাদের দীর্ঘমেয়াদী পদযাত্রা শুরু করলেন, তখন আলোকা তাদের পেছনে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। কোনো লীশ বা আদেশ ছাড়াই, সে স্বাভাবিকভাবে তাদের গতি অনুসরণ করতে শুরু করে। প্রথমে এটি কেবল কৌতূহল ছিল, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কুকুরটি পুরো যাত্রা জুড়ে তাদের সঙ্গে চলতে থাকে। সন্ন্যাসীরা তাকে কোনো আনুষ্ঠানিকভাবে দত্তক নেননি, তবে তার উপস্থিতি তাদের পথচলাকে সমৃদ্ধ করে।
যাত্রা চলাকালীন, কুকুরটি তাপ, ক্লান্তি এবং অচেনা ভূখণ্ডের মুখোমুখি হলেও সন্ন্যাসীদের সঙ্গে সমান গতি বজায় রাখে। বিশ্রাম নেওয়ার সময় সে বিশ্রাম নেয়, চলার সময় সে চলতে থাকে, এবং কোনো বিরক্তি বা ভয় প্রকাশ করে না। তার এই স্বাভাবিক আচরণ সন্ন্যাসীদের জন্য একটি শান্তিপূর্ণ সঙ্গী হয়ে ওঠে, যা তাদের ধ্যান ও মননশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সন্ন্যাসীরা লক্ষ্য করেন যে আলোকা তাদের চারপাশে উপস্থিত থাকলে পরিবেশে এক ধরনের শান্তি ছড়িয়ে পড়ে। তার উপস্থিতি কোনো উত্তেজনা নয়, বরং এক ধরনের অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা ও প্রশান্তি এনে দেয়। এই বৈশিষ্ট্যই তাকে “আলোকা” নামকরণে প্রভাবিত করে, যার অর্থ আলো বা অন্তর্দৃষ্টির স্বচ্ছতা। নামটি তার স্বভাবের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়, কারণ তার উপস্থিতি সত্যিই এক আলোকসজ্জার মতো অনুভূতি দেয়।
এই গল্পটি সমাজের সাধারণ ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে যে, রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো প্রাণীগুলো অদৃশ্য বা অপ্রয়োজনীয়। আলোকা স্বেচ্ছায় সংযোগের পথে পা বাড়িয়ে, নিজের শর্তে সঙ্গী হয়ে উঠেছে। তার এই স্বতঃস্ফূর্ত সঙ্গতি মানব ও প্রাণীর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
বৈশ্বিকভাবে রাস্তায় বেঁচে থাকা প্রাণীর সংখ্যা বাড়ছে, এবং তাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি প্রায়শই অবহেলা বা তুচ্ছতা হয়। আলোকার ১০০ দিনের যাত্রা দেখায় যে, সঠিক পরিবেশ ও সহানুভূতি দিলে এমন প্রাণীগুলোও অনন্য অবদান রাখতে পারে। তার গল্প স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য একটি উদাহরণ, যা রাস্তায় থাকা প্রাণীর প্রতি দায়িত্বশীলতা ও সহানুভূতি জাগিয়ে তুলতে পারে।
অবশেষে, আলোকার যাত্রা আমাদের শেখায় যে, কোনো প্রাণীর মূল্য তার বংশ বা চেহারার ওপর নয়, বরং তার আচরণ ও মানবিক সংযোগের ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। রাস্তায় বেঁচে থাকা প্রাণীর প্রতি যত্নশীল দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা, তাদেরকে সমাজের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, এবং তাদের স্বাভাবিক স্বভাবকে সম্মান করা জরুরি। এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের শহুরে পরিবেশকে আরও মানবিক ও সহনশীল করে তুলবে।
পাঠকরা যদি রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো প্রাণীর প্রতি সহানুভূতি ও দায়িত্বশীলতা গড়ে তোলেন, তবে আলোকার মতো অনন্য সঙ্গতি আমাদের সমাজে নতুন সম্ভাবনা উন্মোচন করতে পারে। রাস্তায় থাকা প্রাণীর প্রতি যত্নশীল মনোভাব গড়ে তোলা, তাদেরকে নিরাপদ আশ্রয় ও সঠিক খাবার প্রদান করা, এবং তাদের স্বাভাবিক আচরণকে সম্মান করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। এই ধরনের উদ্যোগই ভবিষ্যতে আরও অনেক আলোকা-ধরনের গল্পের জন্ম দিতে পারে।



