বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, বাইতুল ইজ্জতে অবস্থিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও কলেজে বুধবার সকাল দশটায় ১০৪তম রিক্রুট ব্যাচের সমাপনী অনুষ্ঠান পরিচালনা করে। ঐ অনুষ্ঠানে আরফান হোসেন, কুড়িগ্রাম ফুলবাড়ী উপজেলার রামখানা‑অনন্তপুর সীমান্তে ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি গুলি করে নিহত কিশোরী ফেলানীর ছোট ভাই, আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ করেন। তার শপথের মূল উদ্দেশ্য স্পষ্ট – আর কোনো পরিবারকে তার বোনের মতো সন্তান হারানোর বেদনা না দিতে সীমান্ত রক্ষায় নিজেকে নিবেদিত করা।
ফেলানী হত্যাকাণ্ডের পটভূমি ২০১১ সালের জানুয়ারি ৭ তারিখে রামখানা‑অনন্তপুর সীমান্তে ঘটে। ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক গুলি চালিয়ে কিশোরী ফেলানীকে হত্যা করা হয় এবং তার দেহকে সীমান্তে ঝুলিয়ে রাখা হয়। ঘটনাটি তৎক্ষণাৎ উভয় দেশের মিডিয়ায় প্রচারিত হয় এবং বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিবাদ জাগায়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকার ও কোর্টের মাধ্যমে বহু তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া চালু হয়, তবে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় এখনও সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হয়নি।
বিজিবি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কমান্ড্যান্ট অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেন, “ফেলানীর মৃত্যু আমাদের সীমান্ত নিরাপত্তা ও মানবিক দায়িত্বের প্রশ্ন তুলেছে। আরফান হোসেনের মতো নাগরিকের স্বেচ্ছাসেবী পদক্ষেপ আমাদের সীমানা রক্ষায় নতুন উদ্যম যোগাবে।” এছাড়া, গৃহ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রও জানিয়েছেন, “ফেলানী হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি জাতীয় নিরাপত্তা নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে; সরকার এই ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
শপথ গ্রহণের পর আরফান হোসেন মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলার সময় তার বোনের স্মৃতি ও গুনাহের শিকারদের প্রতি দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আমি চাই না আর কোনো পরিবারকে আমার বোনের মতো কষ্টের মুখে দেখতে হয়। সীমান্তে গুলি করে হত্যা করা আর কোনো বোনের জীবন নষ্ট না হয়, এটাই আমার অঙ্গীকার।” তার এই প্রতিজ্ঞা তার চার মাসের কঠোর প্রশিক্ষণ শেষে বাস্তবায়িত হয়েছে, যা তার মা‑বাবার দীর্ঘদিনের স্বপ্নকে পূর্ণ করেছে।
ফেলানী হত্যাকাণ্ডের পর থেকে বাংলাদেশে স্মরণীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার গুলশানের কূটনৈতিক এলাকার প্রধান সড়কের একটি অংশ ‘ফেলানী এভিনিউ’ নামে নামকরণ করা হয়েছে। এই পদক্ষেপটি ঘটনার স্মৃতিকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সংরক্ষণ ও পুনরাবৃত্তি রোধের লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে। সরকার এই নামকরণকে “সীমান্তে মানবিক অধিকার রক্ষার প্রতীক” হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বর্ডার গার্ডের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামের কঠোরতা সম্পর্কে গার্ডের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “প্রতিটি রিক্রুটকে শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত করা হয় যাতে তারা সীমান্তে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করতে পারে। আরফান হোসেনের মতো ব্যক্তিরা আমাদের সীমানা রক্ষায় অতিরিক্ত উদ্যম নিয়ে আসবে।” এছাড়া, গার্ডের প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা অনুযায়ী রিক্রুটদেরকে অস্ত্র পরিচালনা, সীমান্ত নজরদারি, মানবিক সহায়তা ও আইনি জ্ঞানসহ বহু দিকের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।
সীমান্তে ঘটিত অপরাধের আইনি দিকেও সরকার সক্রিয়। গৃহ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালের ঘটনার পর বাংলাদেশে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। যদিও কিছু মামলায় অগ্রগতি হয়েছে, তবু পুরো প্রক্রিয়া এখনও চলমান। সরকার এই বিষয়টি নিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা ও মানবিক দায়িত্বের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেছে।
আরফান হোসেনের শপথ গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে সীমান্ত রক্ষার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উন্মোচিত হয়েছে। তিনি বলছেন, “সীমান্তে আমার বোনের মতো আর কোনো প্রাণ হারাতে না পারি, নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেললেও দায়িত্ব পালনে পিছপা হব না।” তার এই দৃঢ় সংকল্প দেশের নিরাপত্তা নীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা আশা প্রকাশ করছেন।
ফেলানীর স্মৃতি ও তার পরিবারের স্বপ্ন এখন নতুন প্রজন্মের সৈন্যদের মধ্যে সঞ্চারিত হচ্ছে। সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বয়ে সীমান্তে মানবিক অধিকার রক্ষার জন্য নীতি ও প্রশিক্ষণকে শক্তিশালী করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন দুঃখজনক ঘটনা পুনরাবৃত্তি না হয়।



