আলু চাষে দাম ওঠানামা এবং ফসলের অতিরিক্ত উৎপাদনের ফলে কৃষকের আর্থিক অবস্থা অনিশ্চিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন বাড়লে বাজারে দাম দ্রুত হ্রাস পায়, আর ফসলের পরিমাণ কমে গেলে দাম উঁচুতে উঠে, ফলে কৃষকরা দু’প্রান্তে ঋণ ও জনসাধারণের অসন্তোষের মুখোমুখি হন। এই চক্রটি পুনরাবৃত্তি হওয়ায় দেশের কৃষি খাতের স্থিতিশীলতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও সরবরাহ শৃঙ্খল অংশীদারদের মতে, সমস্যার মূল কারণ উৎপাদন নয়, বরং আলুর ব্যবহার নীতি ও পরিকল্পনার অভাব। বাংলাদেশে আলুকে মূলত ভাতের সঙ্গে খাওয়া সবজি হিসেবে গণ্য করা হয়, শিল্প কাঁচামাল হিসেবে নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের সময় দামকে শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে দেয়, ফলে কৃষকরা ক্ষতি স্বীকার করতে বাধ্য হন এবং দেশের অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজনের সুযোগ হারায়।
বিশ্বে আলুর উৎপাদন অনুযায়ী বাংলাদেশ সপ্তম স্থানে রয়েছে, তবে শিল্পে ব্যবহার করার হার খুবই কম। চীনে মোট উৎপাদনের প্রায় পনেরো শতাংশ আলু শিল্পে যায়, আর ইউরোপীয় দেশ যেমন নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রে এই হার ষাট থেকে পঁয়ষট্টি শতাংশের মধ্যে। রাশিয়া ও ইউক্রেনের ক্ষেত্রে এটি বিশ থেকে ত্রিশ শতাংশের মধ্যে, আর প্রতিবেশী ভারতেও পাঁচ থেকে সাত শতাংশই প্রক্রিয়াকরণে যায়। তুলনায় বাংলাদেশে মাত্র তিন থেকে চার শতাংশ আলুই কোনো না কোনো শিল্পে ব্যবহার করা হয়।
এই পার্থক্য সরাসরি বাজারের গতি পরিবর্তনে প্রভাব ফেলে। যেখানে অন্য দেশগুলোতে অতিরিক্ত উৎপাদন ফ্যাক্টরিতে রূপান্তরিত হয়ে সরবরাহ শৃঙ্খলকে শক্তিশালী করে, বাংলাদেশে অতিরিক্ত ফসলের ফলে দাম দ্রুত পতন ঘটে এবং কৃষকের আয় হ্রাস পায়। আলু, যা ধান পরের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফসল, যদি শিল্পে ব্যবহার করা হতো তবে অতিরিক্ত উৎপাদনকে শোষণ করার একটি কার্যকর উপায় হতো।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, আলুর শিল্প ব্যবহার বাড়াতে প্রক্রিয়াকরণ কারখানা, ফ্রোজেন পণ্য, চিপস ও অন্যান্য ভোক্তা পণ্য তৈরির জন্য বিনিয়োগের প্রয়োজন। বর্তমানে দেশের প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতা সীমিত, ফলে অধিকাংশ ফসল সরাসরি বাজারে বিক্রি হয়, যা দামকে অস্থির করে। যদি সরকার ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে প্রক্রিয়াকরণ অবকাঠামো বাড়ায়, তবে ফসলের অতিরিক্ত অংশকে মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে রপ্তানি করা সম্ভব হবে এবং কৃষকের আয় স্থিতিশীল হবে।
অন্যদিকে, আলুর দাম নিয়ন্ত্রণের জন্য বর্তমান নীতি মূলত সরবরাহ-চাহিদা ভিত্তিক নয়, বরং ভাতের সঙ্গে সংযুক্ত ভোক্তা পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত। এই পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নয়, কারণ আলুর চাহিদা মৌসুমী এবং ভোক্তা পছন্দের ওপর নির্ভরশীল। তাই নীতি নির্ধারকদের উচিত আলুর শিল্প ব্যবহারকে উৎসাহিত করা, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ করা এবং স্থানীয় প্রক্রিয়াকরণ ইউনিটের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করা।
বাজারে ইতিমধ্যে কিছু বড় কোম্পানি আলুর ফ্রোজেন পণ্য ও চিপস উৎপাদনে আগ্রহ দেখিয়েছে, তবে স্কেল বাড়াতে মূলধন ও প্রযুক্তি ঘাটতি রয়েছে। যদি এই ঘাটতি পূরণ করা যায়, তবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে আলুর নতুন পণ্য লঞ্চের মাধ্যমে মূল্য সংযোজনের সম্ভাবনা তৈরি হবে। এছাড়া, কৃষকদের জন্য সঠিক সঞ্চয় ও বীমা পরিকল্পনা প্রয়োগ করা দরকার, যাতে ফসলের অতিরিক্ত উৎপাদন বা স্বল্প উৎপাদনের সময় আর্থিক ক্ষতি কমে।
সংক্ষেপে, আলুর উৎপাদন বাড়লেও শিল্পে ব্যবহার না হলে দাম পতনের চক্রে আটকে যায়। উৎপাদন ও বাজারের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে কৃষকের ঋণবহুল অবস্থা অব্যাহত থাকবে এবং দেশের অর্থনৈতিক লাভ কমে যাবে। আলুর প্রক্রিয়াকরণ বাড়িয়ে, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ করে এবং নীতি সমন্বয় করে এই চক্র ভাঙা সম্ভব। ভবিষ্যতে যদি সরকার ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে শিল্প ভিত্তিক আলু ব্যবহার বাড়াতে পদক্ষেপ নেয়, তবে কৃষকের আয় স্থিতিশীল হবে, বাজারের অস্থিরতা কমবে এবং দেশের কৃষি রপ্তানি সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে।



