সেনেট ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে একমত ভোটে ডিফায়েন্স (Disrupt Explicit Forged Images and Non-Consensional Edits) আইনকে পুনরায় অনুমোদন করেছে। এই আইনটি এমন ব্যক্তিদের জন্য নাগরিক মামলা করার অধিকার প্রদান করে, যারা তাদের সম্মতি ছাড়া যৌন স্পষ্ট ডিপফেক ছবি তৈরি বা হোস্ট করে। আইনটি প্রথমবার ২০২৪ সালে সেনেটের অনুমোদন পেয়েছিল, তবে হাউসের মাধ্যমে অগ্রসর হতে ব্যর্থ হয়েছিল; এবার উভয় শাখায় সমর্থন পেয়ে কার্যকর হওয়ার পথে।
ডিপফেক প্রযুক্তি, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ছবি ও ভিডিও জেনারেশন টুল, অনলাইনে দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। এই টুলগুলো ব্যবহার করে কেউই অন্যের মুখ বা দেহের ছবি নিয়ে যৌন বিষয়বস্তু তৈরি করতে পারে, যা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সম্মানের গুরুতর লঙ্ঘন। বিশেষ করে X (পূর্বে টুইটার) প্ল্যাটফর্মে গ্রক নামের এআই সহকারী যুক্ত হওয়ার পর থেকে, ব্যবহারকারীরা কোনো পোস্টে “@grok” ট্যাগ করে এবং নির্দিষ্ট অনুরোধ যোগ করে সহজেই এমন কন্টেন্ট তৈরি করতে পারে।
গত এক মাসে গ্রক ব্যবহার করে শিশুদের যৌন স্পষ্ট ছবি তৈরির ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে, যেখানে কেবল একটি মন্তব্যের মাধ্যমে এআইকে নির্দেশনা দিয়ে চিত্র তৈরি করা হয়েছে। এই ধরনের অপব্যবহার অনলাইন নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে এবং বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
যুক্তরাজ্যের মিডিয়া নিয়ন্ত্রক অফকম ইতিমধ্যে X-কে অনলাইন সেফটি অ্যাক্টের সম্ভাব্য লঙ্ঘনের জন্য তদন্তের আওতায় নিয়েছে। একই সঙ্গে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া গ্রক চ্যাটবটকে সম্পূর্ণভাবে ব্লক করেছে, যাতে এআই-সৃষ্ট অবৈধ কন্টেন্টের বিস্তার রোধ করা যায়।
ডিফায়েন্স আইন গ্রক বা অনুরূপ এআই টুলের ব্যবহারকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করে না, তবে এটি কন্টেন্ট তৈরি বা হোস্ট করা ব্যক্তিদের জন্য আর্থিক ও আইনি দায়িত্ব বাড়িয়ে দেয়। আইন অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অবৈধ ডিপফেক তৈরি বা সংরক্ষণ করে, তবে তা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ ও আইনি খরচের দাবি করতে পারে। ফলে এ ধরনের কন্টেন্টের উৎপাদন ও বিতরণে আর্থিক ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে।
সেনেটের সহ-স্পনসর ডিক ডারবিন (ডেমোক্রেটিক, ইলিনয়েস) উল্লেখ করেছেন, এই পদক্ষেপটি ডিজিটাল যুগে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার জন্য অপরিহার্য। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি দ্রুত অগ্রসর হলেও, তার অপব্যবহার রোধে আইনগত কাঠামো তৈরি করা জরুরি।
ডিফায়েন্স আইনের মূল ধারা অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সরাসরি আদালতে মামলা দায়ের করতে পারবে, এবং আদালতকে ডিপফেকের সৃষ্টিকর্তা ও হোস্টিং প্ল্যাটফর্ম উভয়েরই দায়িত্ব নিতে হবে। এছাড়া, আইনটি ক্ষতিগ্রস্তের গোপনীয়তা রক্ষার জন্য অতিরিক্ত সুরক্ষা প্রদান করে, যাতে মামলার সময় তাদের পরিচয় প্রকাশ না হয়।
এই আইনটি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যের ইতিমধ্যে প্রয়োগে থাকা ডিপফেক বিরোধী বিধানগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, এবং ভবিষ্যতে ফেডারেল স্তরে সমন্বিত নীতি গঠনে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ডিপফেকের বিস্তার নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল সেবা আইন (DSA) এবং চীনের অনলাইন কন্টেন্ট নিয়ন্ত্রণ নীতি ইতিমধ্যে এ ধরনের বিষয়কে কেন্দ্র করে কঠোর নিয়মাবলী প্রয়োগ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন আইনটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গৃহীত হয়েছে।
ডিফায়েন্স আইনের কার্যকরী হওয়ার পর, সংশ্লিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে বিশেষজ্ঞরা অনুমান করছেন, প্রথম কয়েক মাসে বেশ কিছু মামলার দায়ের হতে পারে, বিশেষ করে যারা গ্রক ব্যবহার করে অবৈধ কন্টেন্ট তৈরি করেছে তাদের বিরুদ্ধে।
সেনেটের এই পদক্ষেপের পর, হাউসের মতামত এখনও অনিশ্চিত। যদিও পূর্বের সংস্করণে হাউসের অগ্রগতি ধীর ছিল, তবে ডিফায়েন্স আইনের ব্যাপক সমর্থন ও জনমতকে বিবেচনা করে হাউসের নেতৃত্বে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অবশেষে, ডিফায়েন্স আইনটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি শুধুমাত্র আইনি সুরক্ষা নয়, বরং অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে তাদের ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা রক্ষায় আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে উৎসাহিত করবে। ভবিষ্যতে এআই-সৃষ্ট কন্টেন্টের নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর নীতি ও প্রযুক্তিগত সমাধান উদ্ভূত হতে পারে, যা ডিজিটাল সমাজের নিরাপত্তা ও নৈতিকতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে।



