ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্র মিশর, জর্ডান এবং লেবাননের মুসলিম ব্রাদারহুড শাখাকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এই সিদ্ধান্তটি মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) কাতারভিত্তিক আল জাজিরা সংস্থার প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের পেছনে ইসরায়েলের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণের ইচ্ছা রয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবরণে বলা হয়েছে, মুসলিম ব্রাদারহুডের মিশর ও জর্ডান শাখাকে সাধারণ সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, আর লেবাননের শাখাকে আরও কঠোর আইনি পরিভাষা ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ (Foreign Terrorist Organization – FTO) হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এই পার্থক্যটি লেবাননের শাখার আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ঝুঁকি বেশি বলে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যায়নকে প্রতিফলিত করে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে মন্তব্য করে জানান, এটি মুসলিম ব্রাদারহুডের সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির প্রচেষ্টাকে বৈশ্বিকভাবে প্রতিহত করার প্রথম পদক্ষেপ মাত্র। রুবিও জোর দিয়ে বলেন, সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত বা তার সমর্থনকারী গোষ্ঠীগুলোকে আর্থিক ও সম্পদ থেকে বঞ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র তার সব ধরনের আইনগত ও কূটনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করবে।
নতুন নিষেধাজ্ঞার ফলে এই তিন শাখার জন্য কোনো ধরণের বস্তুগত বা আর্থিক সহায়তা প্রদান এখন থেকে মার্কিন আইনে অবৈধ বলে গণ্য হবে। এছাড়া, সংগঠনগুলোর বর্তমান ও প্রাক্তন সদস্যদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রদান বন্ধ করা হয়েছে এবং তাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই ব্যবস্থা গুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতি ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবিরোধী প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
মুসলিম ব্রাদারহুড ১৯২৮ সালে মিশরের ইসলামি পণ্ডিত হাসান আল‑বান্নার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রাচীন ও প্রভাবশালী সংগঠন হিসেবে বিবেচিত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর শাখা গুলো আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সক্রিয় হয়ে উঠেছে এবং তারা সর্বদা শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে আসছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে, সংগঠনটিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে তার কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন মেরুকরণ ঘটতে পারে বলে বিশ্লেষকরা সতর্কতা প্রকাশ করেছেন। মিশর, জর্ডান এবং লেবানন ইতিমধ্যে এই ঘোষণার পর তাদের নিজস্ব আইনগত ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও এখন পর্যন্ত এই তিন দেশের সরকার থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হয়নি, তবে ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের পেছনে ইসরায়েল‑প্যালেস্টাইন সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তার কৌশলগত অংশীদারদের সমর্থন বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর নীতি মুসলিম ব্রাদারহুডের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ককে সীমাবদ্ধ করার পাশাপাশি তার আর্থিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্য বহন করে।
পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক মন্ত্রণালয় এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার জন্য অতিরিক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয়, সংশ্লিষ্ট দেশের নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে তথ্য শেয়ারিং এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রয়োগের জন্য অতিরিক্ত তদারকি। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হল মুসলিম ব্রাদারহুডের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল করা এবং তার কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সীমাবদ্ধ করা।
সংক্ষেপে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই নতুন সন্ত্রাসী তালিকাভুক্তি মিশর, জর্ডান ও লেবাননের মুসলিম ব্রাদারহুড শাখার ওপর সরাসরি আর্থিক ও ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক গতিপথে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর অবস্থান আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবিরোধী নীতির অংশ হিসেবে চালু হয়েছে এবং এর প্রভাব অঞ্চলীয় নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক গতিশীলতায় দীর্ঘমেয়াদে অনুভূত হবে।



