মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) ভোরবেলায় কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় হোয়াইক্যং সীমান্তে গুলির শব্দ শোনা যায়, যেখানে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের চলমান ত্রিমুখী সংঘর্ষের সরাসরি প্রভাব পড়ছে। গুলির খোসা তেচ্ছি সেতুর পাশে অবস্থিত পূর্বপাড়া এলাকায় আবু তাহেরের বাড়ির আঙিনায় পড়ে, ফলে আশেপাশের বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে তাদের নিজ ঘর ছেড়ে চলে যায়।
আহত গুলির পরে, নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ বেশ কয়েকটি পরিবার তৎক্ষণাৎ তাদের আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে স্থানান্তরিত হয়। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, পূর্বপাড়া বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম জানান, “আমরা সব সময় আতঙ্কে থাকি, অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে বসে আছে।” একই সময়ে আবু তাহের উল্লেখ করেন, সংঘর্ষের ফলে নাফ নদে মাছ শিকারের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে এবং অনেক বাড়িতে চুলা জ্বালানোর সুবিধা নেই, যা পরিবারকে আর্থিক ও সামাজিকভাবে কঠিন অবস্থায় ফেলেছে।
স্থানীয় জরিপে দেখা যায়, তেচ্ছি সেতুর সংলগ্ন পূর্বপাড়া এলাকায় অন্তত দশ থেকে বারোটি পরিবার নিরাপত্তার অভাবে তাদের বাড়ি ত্যাগ করে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। এই পরিবারগুলোর মধ্যে আবুল কালাম, আনোয়ার, আমির হোসেন, জোৎসনা ও নাজির হোসেনের পরিবার অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে ঐ এলাকার অধিকাংশ বাড়ি তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচলকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহ জালাল জানান, গত দুই দিনে ধারাবাহিক গুলিবর্ষা ও মাইন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে; একটি গুলিবিদ্ধ ব্যক্তি এবং আরেকজন মাইন বিস্ফোরণে আহত হয়ে বর্তমানে চিকিৎসাধীন। তিনি যোগ করেন, “প্রতিনিয়ত গুলির শব্দ শোনা যায়, তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।”
সীমান্তে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বাংলাদেশ গ border গার্ড (বিজিবি) টহল বাড়িয়ে দিয়েছে। হোয়াইক্যং থানা ইনচার্জ খোকন চন্দ্র দে জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং সীমান্তে নিয়মিত গার্ডের উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত ও স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা চেয়ে দাবি করছেন।
এই ঘটনা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান ত্রিমুখী সংঘর্ষের বিস্তৃত প্রভাবের অংশ, যেখানে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী ও আর্থিক স্বার্থের গোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র লড়াই চলছে। সীমান্তবর্তী বাংলাদেশে শরণার্থীর প্রবাহ, বাণিজ্যিক কার্যক্রমের ব্যাঘাত এবং মানবিক সংকটের ঝুঁকি বাড়ার ফলে ঢাকা ও নায়েডো সরকার উভয়ই কূটনৈতিক চ্যানেল সক্রিয় করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা চেষ্টা করছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, “মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে নিরাপত্তা হ্রাস উভয় দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।” তারা যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ASEAN দেশের সঙ্গে সমন্বিত পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছেন, যাতে সীমান্তে হিংসা কমে এবং শরণার্থীর নিরাপদ রফতানি নিশ্চিত হয়।
গত রবিবার, মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে হুজাইফা সুলতানা আফনান নামের এক শিশুকে গুলি করে আহত করা হয়। শিশুটি চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি হয় এবং চিকিৎসকেরা উন্নত চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞ হাসপাতালে রেফারেল করার পরামর্শ দিয়েছেন। বর্তমানে শিশুটি সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে এবং তার স্বাস্থ্যগত অবস্থা দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নজরে রয়েছে।
হোয়াইক্যং সীমান্তে গুলিবর্ষা এবং বাড়ি ত্যাগের ধারাবাহিকতা স্থানীয় জনগণের জীবনের নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকারকে হুমকির মুখে ফেলেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন ও দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে সীমান্তে স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হলে, শরণার্থী প্রবাহ ও মানবিক সংকটের পরিধি বাড়তে পারে।



