কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ২০২৬ সালের শুরুর দিকে চীন ভ্রমণ করেন, যেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ সন্ধানের লক্ষ্য রাখছেন। এই সফরটি কানাডার বাণিজ্য নীতি পুনঃনির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কার্নি ২০১৭ সালের পর প্রথমবারের মতো চীনে গমন করেন, যা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত। কানাডা-চীন সম্পর্কের পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে এই সফরকে সরকার “গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক” বলে বর্ণনা করেছে।
কানাডা বহুমুখী বাণিজ্য কৌশল অনুসরণ করতে চায়, তবে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি। মানবাধিকার ও জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জগুলোও এই দ্বিপাক্ষিক আলোচনার অংশ হবে।
যুক্তরাষ্ট্র কানাডার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হওয়ায়, তার সঙ্গে সম্পর্কের অনিশ্চয়তা বাড়ার ফলে কানাডা চীনের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামল করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে চায়। এই প্রেক্ষাপটে চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা কৌশলগত গুরুত্ব পেয়েছে।
কানাডার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সফরটিকে দেশের অ-যুক্তরাষ্ট্রীয় রপ্তানি দশকে দ্বিগুণ করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরবর্তী দশকে কানাডা তার রপ্তানি গন্তব্যকে বৈচিত্র্যপূর্ণ করে অর্থনৈতিক ঝুঁকি কমাতে চায়।
প্রধানমন্ত্রীর অফিস জানিয়েছে যে, সফরের আলোচনার মূল বিষয়গুলোতে বাণিজ্য, কৃষি এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি, কৃষি পণ্যের রপ্তানি ও নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বেইজিংয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুই দেশের “সামাজিক স্বার্থ” উল্লেখ করে, মানুষ-মানুষের সংযোগ এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। এই মন্তব্যগুলো দুই দেশের সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করার ইচ্ছা প্রকাশ করে।
গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের মধ্যে বৃহস্পতিবারের দিন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং এবং জাতীয় জনগণ সংসদের স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে সাক্ষাৎ অন্তর্ভুক্ত। এই বৈঠকগুলোতে উভয় পক্ষের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো আলোচনা হবে।
শুক্রবারের দিন কার্নি চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎ করবেন, যা গত বছর দক্ষিণ কোরিয়ার এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা শীর্ষ সম্মেলনে দুজনের প্রথম সাক্ষাতের পরের ধারাবাহিকতা। এই একান্ত বৈঠকে উচ্চস্তরের কূটনৈতিক বিষয়গুলো নিয়ে গভীর আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কানাডা-চীন সম্পর্কের নিম্নগতি ২০১৮ সালে শুরু হয়, যখন হুয়াওয়ের নির্বাহী মেং ওয়ানঝো ভ্যাঙ্কুভারে যুক্তরাষ্ট্রের ইরান নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগে গ্রেফতার হন। এই ঘটনার ফলে বেইজিং রাগান্বিত হয়ে কানাডার দুই নাগরিককে গুপ্তচরবৃত্তি অভিযোগে গ্রেফতার করে।
মেং ওয়ানঝো এবং দুই কানাডিয়ান নাগরিক ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রসিকিউটরের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের পর মুক্তি পান। এই ঘটনা দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাসের শূন্যতা বাড়িয়ে দেয় এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কের উপর চাপ সৃষ্টি করে।
সাম্প্রতিক সময়ে চীনকে কানাডার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ করা হয়েছে, যার ফলে একটি জনসাধারণের তদন্তের আহ্বান জানানো হয়েছে। এই বিষয়টি উভয় দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
কার্নির চীনে সফর কানাডার বাণিজ্যিক বৈচিত্র্যকরণ এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে উভয় দেশ কীভাবে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সহযোগিতা গড়ে তুলবে, তা কানাডার অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং আন্তর্জাতিক অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



