ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. খোরশেদ আলম ১৩ জানুয়ারি রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের আয়োজিত “প্রসঙ্গ: গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন ২০২৫” শীর্ষক অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেন, দেশের অধিকাংশ পত্রিকার মালিকই একই সঙ্গে সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন। তিনি বলেন, এই অবস্থা মিডিয়াকে সম্পূর্ণ কর্পোরেট কাঠামোর অধীনে নিয়ে এসেছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সামনে তিনি এই বিষয়টি তুলে ধরেন যে, মিডিয়া সংস্কার আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য হল বিদ্যমান সিস্টেমে মৌলিক পরিবর্তন আনা। তিনি উল্লেখ করেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগে সাংবাদিকরা প্রধান শিকারী হয়ে উঠেছেন।
ডিজিটাল নিরাপত্তা সংক্রান্ত মামলার পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০১২ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে মোট এগারোজন সাংবাদিকের প্রাণহানি হয়েছে এবং ত্রিশজনের নিখোঁজ হওয়ার রেকর্ড রয়েছে। একই সময়ে, পাঁচশেরও বেশি ব্যক্তি এই আইনের অধীনে মামলায় জড়িয়ে পড়েছেন।
প্রেস কাউন্সিলের অকার্যকারিতা সম্পর্কে তিনি তীব্র সমালোচনা করেন। ২০২৪ সালে কাউন্সিল আটটি সভা পরিচালনা করলেও, সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তিনি সতর্ক করেন, যদি মিডিয়াকে শুধুমাত্র লাভজনক ব্যবসা হিসেবে দেখা হয়, তবে তা জনস্বার্থের চেয়ে ক্লিকবেইট সংবাদে বেশি ঝুঁকবে।
সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে ডিজিটাল মিডিয়ার গুরুত্বকে যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি, এ কথাও তিনি উল্লেখ করেন। এআই ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক ডিজিটাল নিউজের যুগে আইটি বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ অপরিহার্য, কিন্তু প্রতিবেদনে তা অনুপস্থিত।
ড. আলমের মতে, ভবিষ্যতে মিডিয়া নীতি গঠনে প্রযুক্তিগত জ্ঞানসম্পন্ন পেশাদারদের অন্তর্ভুক্তি না হলে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভুল তথ্যের বিস্তার রোধ করা কঠিন হবে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান নিয়মাবলী সাংবাদিকদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ।
অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে সংবিধান গবেষক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আরিফ খান মন্তব্য করেন, বেশিরভাগ কমিশনের প্রতিবেদন সাধারণ পাঠকের জন্য জটিল ও অপ্রবেশযোগ্য। তিনি উল্লেখ করেন, এসব নথি বোধগম্য করতে বিশেষজ্ঞের সাহায্য প্রয়োজন।
খান আরও প্রস্তাব দেন, প্রতিবেদনগুলোতে সহজবোধ্য সারণি বা টেবিল যুক্ত করা হলে, নীতি-নির্ধারক ও সাধারণ মানুষ উভয়েরই বিষয়টি দ্রুত বুঝতে পারবে। তিনি বলেন, তথ্যের স্বচ্ছতা বাড়াতে এই ধরনের ভিজ্যুয়াল উপস্থাপন অপরিহার্য।
মিডিয়া মালিক-সম্পাদক একসাথে থাকা অবস্থায় স্বতন্ত্র সম্পাদনা নীতি গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতি সাংবাদিকদের স্বায়ত্তশাসন ও বিষয়বস্তুর গুণগত মানকে প্রভাবিত করছে।
ড. আলমের বিশ্লেষণে দেখা যায়, মিডিয়া সংস্কার আন্দোলনের ত্বরান্বিত হওয়ার পেছনে মূল কারণ হল স্বার্থপর কর্পোরেট কাঠামোর আধিপত্য। তিনি জোর দেন, সিস্টেমিক পরিবর্তন ছাড়া মিডিয়ার স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
প্রেস কাউন্সিলের অপ্রতুল পদক্ষেপের ফলে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কোনো কার্যকর মেকানিজম গড়ে ওঠেনি। এই ঘাটতি ভবিষ্যতে মিডিয়া স্বাধীনতাকে আরও ক্ষুণ্ন করতে পারে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগে সাংবাদিকদের ওপর চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, আইনি কাঠামোর পুনর্বিবেচনা জরুরি। ড. আলমের মতে, আইনের ন্যায়সঙ্গত প্রয়োগ এবং সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা উচিত।
সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনকে যদি প্রযুক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্বিবেচনা করা হয়, তবে মিডিয়া নীতি গঠনে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যোগ হবে। এআই ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ভূমিকা স্বীকার না করলে, নীতি বাস্তবায়নে বড় বাধা সৃষ্টি হবে।
অবশেষে, আরিফ খান উল্লেখ করেন, নীতিনির্ধারক ও গবেষকদের উচিত প্রতিবেদনগুলোকে সহজবোধ্য করে তোলা, যাতে সাধারণ নাগরিকও মিডিয়া সংস্কার প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারে। এই ধরনের স্বচ্ছতা মিডিয়ার ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



