জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের মধ্যে মঙ্গলবার ফোনে আলোচনা হয়। উভয় পক্ষ নির্বাচনকালীন ভুয়া তথ্যের বিস্তার রোধে আন্তর্জাতিক সহায়তা চাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছে। এই কথোপকথনটি ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে অনুষ্ঠিত হয়।
উপদেষ্টা ইউনূস উল্লেখ করেন, আসন্ন ভোটের পরিবেশে দেশীয় ও বিদেশি উভয় প্রকারের মিডিয়া থেকে মিথ্যা তথ্যের প্রবাহ বেড়ে গেছে। সামাজিক নেটওয়ার্কে গুজব, ভুয়া খবর এবং অপ্রমাণিত অভিযোগের মাধ্যমে তথ্যের গুণগত মান হ্রাস পায়, যা ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ভলকার তুর্ক এ বিষয়ে সচেতনতা প্রকাশ করে বলেন, জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করতে প্রস্তুত। তিনি উল্লেখ করেন, ভুয়া তথ্যের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি এবং তা নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক সমর্থন অপরিহার্য।
দু’জনের মধ্যে সমঝোতা হয় যে, জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে এবং তথ্য‑প্রযুক্তি, মিডিয়া পর্যবেক্ষণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত ও নীতিগত সহায়তা দেবে। তুর্কের মতে, এই সহযোগিতা নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
নির্বাচন কমিশন বর্তমানে ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণের জন্য প্রার্থীদের তালিকা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। একই দিনে সংস্কার সংক্রান্ত গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে, যা দেশের রাজনৈতিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
ফোনালাপে উভয় নেতা নির্বাচনের গুরুত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, গুম সংক্রান্ত কমিশনের কাজ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি) গঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মতবিনিময় করেন। তুর্ক গুম সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে সমাধান করার জন্য একটি সত্যিকারের স্বাধীন এনএইচআরসি গঠনের ওপর জোর দেন।
ইউনূস জানান, গুম সংক্রান্ত কমিশনের জন্য প্রয়োজনীয় অধ্যাদেশ ইতিমধ্যে জারি হয়েছে এবং নির্বাচনের আগে নতুন এনএইচআরসি পুনর্গঠন করা হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সরকারপ্রধান গুম সংক্রান্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের কাছে হস্তান্তর করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী এই নথিটিকে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্বৈরাচারী শাসনামলে ঘটিত গুমের শিকারদের জন্য জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তুর্ক এই প্রতিবেদনকে দেশের মানবাধিকার রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
গত দেড় বছরে ইউনূসের উদ্যোগগুলোকে তুর্ক প্রশংসা করে বলেন, আন্তর্জাতিক সমর্থন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করেছে। তিনি ভবিষ্যতে তথ্য‑নির্ভর নির্বাচন নিশ্চিত করতে আরও সমন্বিত কাজের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
এই আলোচনার পর, উভয় পক্ষের মধ্যে সহযোগিতার কাঠামো চূড়ান্ত করার জন্য পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে অতিরিক্ত বৈঠক নির্ধারিত হয়েছে। তথ্য‑প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, সিভিল সোসাইটি সংগঠন এবং মিডিয়া সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ভুয়া তথ্যের বিস্তার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত, জাতিসংঘের সহায়তা বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, ন্যায়সঙ্গত এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।



