বাংলাদেশের প্রধান সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী শিলপগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গত সপ্তাহে দু’বারের আগুনে বিশাল ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছে। ১৮ ডিসেম্বর প্রথমে অগ্নিকাণ্ডের সূত্র পাওয়া যায়, আর পরের দিন, ১৯ ডিসেম্বর, একই স্থানে পুনরায় দাহযন্ত্র চালু হয়। দু’টি ঘটনার ফলে সংগঠনের ৫৭ বছর পুরোনো নথি, বাদ্যযন্ত্র, স্মারক এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক সামগ্রী সম্পূর্ণভাবে পুড়ে যায়।
দাহের পর কার্যালয়ের ভেতরে ধ্বংসস্তূপের দৃশ্য দেখা যায়; আধা‑পোড়া হারমোনিয়াম মেঝেতে শুয়ে আছে, গিটারের ভাঙ্গা অংশ, তবলা, ঢোল, খোল এবং একতারসহ নানা বাদ্যযন্ত্র ছাই‑ধূমে ঢাকা। পুড়ে যাওয়া নথিপত্রের মধ্যে প্রতিষ্ঠার শুরুর দিন থেকে সংগৃহীত স্মারক, পুরস্কার, নাটকের কস্টিউম, প্রপস এবং দুর্লভ গ্রন্থ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
আক্রমণকারী গোষ্ঠীর পরিচয় এখনও স্পষ্ট না হলেও, ঘটনাস্থলে পাওয়া গৃহস্থালি গ্যাসের ট্যাঙ্ক এবং অগ্নি‑সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। স্থানীয় পুলিশ তদন্তে জোর দিচ্ছে যে, অপরাধীরা কীভাবে সরাসরি কার্যালয়ে প্রবেশ করে অগ্নি‑সামগ্রী স্থাপন করেছে তা নির্ণয় করা হবে। তদন্তের প্রথম ধাপ হিসেবে, ফোরেন্স দল ধ্বংসাবশেষ থেকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও ভিডিও রেকর্ডিং সংগ্রহ করেছে।
উদীচীর কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য রুমি প্রভা ঘটনাস্থলে স্থাপিত একটি রক্তাক্ত পাখির মূর্তির ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, “রক্তের রঙে রাঙানো এই পাখি আমাদের হৃদয়ের ব্যথা ও ক্ষতকে বিশ্বব্যাপী প্রকাশের প্রতীক। আমরা এটিকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করছি, যাতে কোনো হিংসা বা হুমকি শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের থামাতে না পারে।” পাখির ডানা কেটে ফেলা এবং ডানা ছেঁড়ার চেষ্টার মাধ্যমে স্বাধীন সৃষ্টিশীলতার ওপর আক্রমণকে চিত্রিত করা হয়েছে।
সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় ঘটনাটিকে ‘সাংস্কৃতিক সম্পদের গুরুতর ক্ষতি’ হিসেবে উল্লেখ করে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত তদন্তের নির্দেশ দেয়। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, “এই ধরনের হিংসাত্মক কাজ আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির নিরাপত্তা ও স্বায়ত্তশাসনের প্রতি সরাসরি হুমকি। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে অপরাধী সনাক্তকরণ ও শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।”
পুলিশের মতে, আগুনের সূত্রপাতের সময় কার্যালয়ের দরজা ও জানালার কোনো চিহ্ন না থাকায়, আক্রমণকারীরা সম্ভবত অভ্যন্তর থেকে অগ্নি‑সামগ্রী নিয়ে এসেছেন। তদন্তে সন্দেহভাজনদের তালিকায় স্থানীয় রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও অপ্রিয় গোষ্ঠীর নাম উঠে এসেছে, তবে কোনো আনুষ্ঠানিক নাম প্রকাশ করা হয়নি।
উদীচীর সদস্যরা উল্লেখ করেন, আগুনের ফলে সংগঠনের ৫৭ বছরের ইতিহাসের পাশাপাশি বহু মূল্যবান নথি ও শিল্পকর্ম হারিয়ে গেছে, যা পুনরুদ্ধার করা কঠিন। তারা দাবি করছেন যে, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং সাংস্কৃতিক সম্পদের সংরক্ষণে সরকারি সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন।
অধিকাংশ শিল্পী ও সমর্থকরা সামাজিক মিডিয়ায় শোক প্রকাশ করে, এবং উদীচীর পুনর্গঠন ও পুনরায় সঞ্চয় কাজের জন্য তহবিল সংগ্রহের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে, তারা আইনগত পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যাতে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা যায়।
এই ঘটনার পর, ঢাকা শহরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও থিয়েটারগুলোতে নিরাপত্তা বাড়াতে অতিরিক্ত গার্ড ও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। স্থানীয় আইনজীবীরা উল্লেখ করেন, অগ্নিকাণ্ডের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের মূল্যায়ন ও ক্ষতিপূরণ দাবি করার জন্য আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করা উচিত।
সামগ্রিকভাবে, উদীচীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ধ্বংসাবশেষ এবং রক্তাক্ত পাখির প্রতীকী প্রদর্শনী দেশের সাংস্কৃতিক পরিবেশে গভীর শক সৃষ্টি করেছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে দায়ী ব্যক্তিদের সনাক্তকরণ এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখনই জরুরি।



