দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি, সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী আবু হেনা মোস্তফা কামাল ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ঘুষের অর্থকে “মায়ের দান” হিসেবে আয়কর নথিতে উল্লেখ করার অভিযোগে চার্জশিট অনুমোদন করেছে। অনুমোদিত চার্জশিটটি দুদকের পাবনা সমন্বিত জেলা কার্যালয় থেকে আদালতে দাখিল করা হয়েছে।
কামাল ২০০১-২০০২ থেকে ২০০৬-২০০৭ করবর্ষ পর্যন্ত নিজের আয়কর রিটার্নে মায়ের কাছ থেকে মোট ছয় কোটি বিশ লাখ টাকা দান হিসেবে গ্রহণের তথ্য উল্লেখ করছিলেন। তবে দুদকের তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে, এই অর্থ মূলত ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত, যা তিনি অবৈধভাবে দান হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
তদন্তে আরও জানা যায়, কামাল ২০০১-২০০২ থেকে ২০০৬-২০০৭ পর্যন্ত ছয় কোটি বিশ লাখ টাকার অধিকাংশ অংশকে মায়ের দান হিসেবে রেকর্ড করলেও, একই সময়ে তিনি বিভিন্ন সরকারি চুক্তি ও প্রকল্পে অনিয়মিতভাবে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করছিলেন। এই অর্থের প্রকৃত উৎসকে ঘুষ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অধিকন্তু, দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কামাল ২ কোটি সত্তর লাখ টাকা তার স্ত্রী ডা. জোবাইদা শাহনূর রশিদকে বিভিন্ন সময়ে দান হিসেবে প্রদান করেছেন। উভয়ের আয়কর নথিতে দান গ্রহণ ও প্রদানের তথ্য থাকলেও, দুদক এটিকে অবৈধ আয় স্থানান্তর ও লেয়ারিং প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করেছে, যা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের অধীনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
দুদকের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কামাল ২০২২ সালে দুদকের নির্দেশে জমা দেওয়া সম্পদ বিবরণীতে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ মিলিয়ে মাত্র দুই কোটি একুশ লাখ নব্বই হাজার তিনশো বাণিজ্যিক টাকার হিসাব দেখিয়েছিলেন। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তার প্রকৃত সম্পদ তিন কোটি তেরো লাখ এগারো হাজার চারশো সত্তর টাকা, অর্থাৎ প্রায় এক কোটি নব্বই লাখ টাকার সম্পদ তিনি গোপন করেছেন।
পরিবারিক ব্যয়, সম্পত্তি ও অন্যান্য সম্পদের হিসাব মিলিয়ে কামালের মোট সম্পদ সাত কোটি পঁচাশি লাখ ছিয়ানব্বই হাজার ছয়শো টাকা নির্ধারিত হয়েছে। এর বিপরীতে, তার স্বীকৃত আয় মাত্র এক কোটি পঞ্চাশ লাখ নব্বই হাজার দুইশো ছিয়ানব্বই টাকা, যা উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নির্দেশ করে।
দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় পাবনা থেকে দাখিল করা অভিযোগপত্রে কামালকে অর্থ লেনদেনের অবৈধতা, লেয়ারিং এবং মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো আদালতীয় রায় প্রকাশিত হয়নি, তবে অভিযোগপত্রের অনুমোদনের পর প্রক্রিয়াগত পর্যায়ে মামলা চলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কামাল বর্তমানে সড়ক ও জনপথ বিভাগের পশ্চিমবঙ্গ ব্রিজ ইম্প্রুভমেন্ট প্রকল্পের অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন। যদিও তিনি ঢাকায় কর্মরত, তার স্থায়ী ঠিকানা মেহেরপুরের গাংনী গ্রামে। এই তথ্য দুদকের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদ প্রকাশ করেছেন।
দুদকের তদন্তে পাওয়া প্রমাণের ভিত্তিতে, কামাল ও তার স্ত্রীর আয়কর রিটার্নে দান হিসেবে উল্লেখিত অর্থকে অবৈধ আয় স্থানান্তর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আইনগতভাবে, এই ধরনের লেনদেন মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের অধীনে শাস্তিযোগ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
দুদক চার্জশিট অনুমোদনের পর, মামলাটি সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠানো হয়েছে। আদালতে মামলার শোনার তারিখ নির্ধারিত হলে, উভয় পক্ষকে যথাযথভাবে উপস্থিত হতে হবে এবং প্রমাণাদি উপস্থাপন করতে হবে। মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে পরবর্তী তথ্য দুদকের অফিস থেকে জানানো হবে।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, সরকারি সংস্থা ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য কঠোর তদারকি প্রয়োজনীয়তা পুনরায় জোর দেওয়া হয়েছে। দুদক কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপগুলোকে দুর্নীতি বিরোধী নীতি বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সর্বশেষে, মামলার ফলাফল ও আদালতের রায়ের ভিত্তিতে, কামাল ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে আর্থিক অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করা হবে। এই প্রক্রিয়ায় আইনি নীতি ও প্রমাণের ভিত্তিতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।



