কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলা, হুইকং ইউনিয়নের তেস্চি সেতু এলাকায় বসবাসকারী এক শিশুকে মিয়ানমারের সীমান্তে সংঘটিত তীব্র গুলিবর্ষণ থেকে গুলি লেগে গুরুতর আঘাত হয়। গুলি ছুঁড়ে দেওয়া গুলির উৎস ছিল আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে চলমান সংঘর্ষ, যা শনিবার রাত ১১টা থেকে রবিবার সকাল ১০টা পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। গুলি লেগে শিশুর মস্তিষ্কের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশে বুলেট আটকে যায়, ফলে তার জীবন রক্ষার জন্য তৎক্ষণাৎ বিশেষ চিকিৎসা প্রয়োজন হয়।
শিশুর নাম হুজাইফা আফনান, যাকে গুলি লেগে যাওয়া সময়ের সঠিক মুহূর্তে সীমান্তের পার্শ্ববর্তী টোটার দ্বীপে গুলিবর্ষণ শুরু হয়। গুলিবর্ষণটি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সীমান্তে আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর মধ্যে তীব্রতা বাড়িয়ে চলেছিল, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলেছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তাসলিম উদ্দিনের মতে, শিশুর মস্তিষ্কে আটকে থাকা বুলেটটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান করায় অপসারণের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। বহু ঘন্টার জটিল শল্যচিকিৎসার পরেও বুলেটটি সরানো সম্ভব হয়নি, এবং বুলেট অপসারণের কোনো প্রচেষ্টা শিশুর প্রাণের জন্য হুমকি স্বরূপ হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে শিশুটিকে দেশের শীর্ষস্থানীয় স্নায়ু চিকিৎসা কেন্দ্র, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটাল (NINS)‑এ স্থানান্তর করা হয়েছে। সেখানে উন্নত স্নায়ু শল্যচিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবা প্রদান করা হবে, যা স্থানীয় হাসপাতালের সক্ষমতার বাইরে।
চিকিৎসা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের পেছনে হাসপাতালের বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা রয়েছে। তারা উল্লেখ করেন যে, বুলেটটি মস্তিষ্কের এমন অংশে আটকে আছে যেখানে কোনো হস্তক্ষেপই রোগীর জীবনকে বিপন্ন করতে পারে। তাই, শিশুর বর্তমান অবস্থা স্থিতিশীল রাখতে বুলেটটি অপরিবর্তিত অবস্থায় রেখে, বিশেষায়িত স্নায়ু চিকিৎসা কেন্দ্রের সহায়তা নেওয়া হয়েছে।
সেই সময়ে আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর মধ্যে সীমান্তে গুলিবর্ষণ অব্যাহত থাকায় স্থানীয় জনগণ উদ্বেগে ভুগছিল। এই ধরনের সংঘর্ষের ফলে সীমান্ত পারাপার গুলিবর্ষণ এবং অনিয়ন্ত্রিত গুলির বিক্ষেপ ঘটছে, যা বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলছে।
অন্যদিকে, একই ইউনিয়নের লামবাবিল এলাকায় ২৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ হানিফ নামের এক কৃষককে ভূমি মাইন বিস্ফোরণে বাম পা হারাতে বাধ্য করা হয়। হানিফ মাছের পুকুরে কাজ করছিলেন, যখন মাইনটি বিস্ফোরিত হয়ে তার পা কেটে দেয় এবং তাকে নদীতে ছুঁড়ে দেয়।
স্থানীয় মৎস্যজীবীরা হানিফকে নদী থেকে উদ্ধার করে, প্রথমে উখিয়ার কুতুপাতলং ইউনিয়নের এমএসএফ হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে শল্যচিকিৎসা করা হয়।
শল্যচিকিৎসার সময় ডাক্তারেরা হানিফের বাম পা সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তা কেটে ফেলতে বাধ্য হন। অপারেশনটি রাত ৩টায় সম্পন্ন হয় এবং হানিফের অবস্থা এখনও গুরুতর হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। তার ভাই অন্বর হোসেন জানান, হানিফের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল হলেও পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া দীর্ঘ এবং চ্যালেঞ্জপূর্ণ।
স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি করেন যে, মাইনটি আরাকান আর্মি সীমান্তে রাখাইন রাজ্যে গোপনে বসিয়ে রেখেছিল। তারা উল্লেখ করেন যে, সীমান্তে এমন মাইন বসানো বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কোনো যুক্তি নয় এবং তা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘন।
সরকারি কর্তৃপক্ষ বর্তমানে এই দুই ঘটনার ওপর তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। সীমান্তে গুলিবর্ষণ ও মাইন বসানোর অভিযোগের জন্য সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থা ও সামরিক দপ্তরকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সীমান্তে পর্যবেক্ষণ বাড়ানো এবং বেসামরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই দু’টি ঘটনা স্থানীয় জনগণের মধ্যে নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে এবং সীমান্তে চলমান সংঘর্ষের মানবিক প্রভাবকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দায়িত্বশীলদের আইনি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।



