বাংলাদেশ সরকার তার বাণিজ্য নীতি সংশোধনের অংশ হিসেবে খেজুরের আমদানি শুল্কে চৌদ্দশ শতাংশের পরিবর্তে চৌদ্দশ শতাংশ হ্রাস করে মোট ৪০ শতাংশ কমিয়ে দেয়। এই পদক্ষেপটি ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ থেকে কার্যকর হয়েছে এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেয়েছে। শুল্ক হ্রাসের লক্ষ্য মূলত ভোক্তাদের জন্য দাম কমানো এবং বাজারে সরবরাহ বাড়ানো।
শুল্কের হ্রাসের ফলে আমদানি করা খেজুরের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে, যা সরাসরি রিটেইল দামের উপর প্রভাব ফেলবে। পূর্বে শুল্কের উচ্চ মাত্রা কারণে খেজুরের দাম তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল, ফলে স্থানীয় উৎপাদনকারীদের তুলনায় আমদানি পণ্যই বেশি জনপ্রিয় ছিল। নতুন শুল্ক কাঠামো এই ভারসাম্যকে পরিবর্তন করে দেশীয় উৎপাদনকে উত্সাহিত করবে।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, শুল্ক হ্রাস আমদানি ব্যবসায়ীদের জন্য নগদ প্রবাহের চাপ কমাবে। কম শুল্কের ফলে আমদানি খরচ কমে, ব্যবসায়ীরা কম মূল্যে পণ্য সরবরাহ করতে পারবে এবং মুনাফার মার্জিন বাড়বে। ফলে বাজারে নতুন খেলোয়াড়ের প্রবেশের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে এবং প্রতিযোগিতা তীব্র হবে।
কৃষক সমিতিগুলি ইতিমধ্যে শুল্ক হ্রাসকে স্বাগত জানিয়েছে, কারণ এটি স্থানীয় খেজুর উৎপাদনের চাহিদা বাড়াবে। কম দামের আমদানি পণ্য স্থানীয় উৎপাদনকারীদের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হলেও, সরকার স্থানীয় চাষাবাদকে সমর্থন করার জন্য অতিরিক্ত সহায়তা প্যাকেজের ঘোষণা দিয়েছে। এই সমন্বয়মূলক নীতি বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে।
বাণিজ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর বাংলাদেশে মোট খেজুরের আমদানি প্রায় ১.৫ লাখ টন ছিল, যার বেশিরভাগই মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকান দেশ থেকে আসত। শুল্ক হ্রাসের ফলে এই পরিমাণে পরিবর্তন আসতে পারে, বিশেষ করে কম দামের সরবরাহকারী দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তি বাড়বে। তবে শুল্কের হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে কাস্টমস প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গতি বাড়াতে হবে, যাতে লজিস্টিক্সের খরচও কমে।
বাজার বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, শুল্ক হ্রাসের প্রথম ত্রৈমাসিকে খেজুরের গড় বিক্রয়মূল্য প্রায় ১০-১৫ শতাংশ কমে যাবে। এই মূল্য হ্রাসের ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, ফলে বিক্রয় পরিমাণে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি প্রত্যাশিত। একই সঙ্গে রিটেইল চেইনগুলোকে স্টক ম্যানেজমেন্টে নতুন কৌশল গ্রহণ করতে হবে, যাতে অতিরিক্ত মজুদ থেকে ক্ষতি না হয়।
আর্থিক বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে শুল্ক হ্রাসের ফলে মুদ্রা রিজার্ভের উপর চাপ কমবে, কারণ কম শুল্কের ফলে আমদানি পেমেন্টের পরিমাণ হ্রাস পাবে। তবে যদি শুল্ক হ্রাসের ফলে আমদানি পরিমাণ বাড়ে, তবে সামগ্রিক পেমেন্টের পরিমাণে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। তাই সরকারকে শুল্ক হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্য ভারসাম্য রক্ষার জন্য রপ্তানি উৎসাহের নীতি চালু রাখতে হবে।
খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন, খেজুরের সরবরাহ বাড়লে মৌসুমী ঘাটতি কমে যাবে এবং রপ্তানি সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে কিছু অঞ্চলে খেজুর চাষের জন্য উপযুক্ত জলবায়ু শর্ত তৈরি করেছে, এবং শুল্ক হ্রাসের ফলে এই উদ্যোগকে ত্বরান্বিত করা সম্ভব হবে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় উৎপাদন বাড়বে এবং রপ্তানি আয়ও বৃদ্ধি পাবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত নোটিশে বলা হয়েছে, শুল্ক হ্রাসের পর নতুন শুল্ক হার ১০ শতাংশে নির্ধারিত হয়েছে, যা পূর্বের ৫০ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হ্রাস। এই হারটি সকল ধরণের খেজুরের আমদানি পণ্যের উপর সমানভাবে প্রযোজ্য হবে, যার মধ্যে তাজা, শুকনো ও প্রক্রিয়াজাত পণ্য অন্তর্ভুক্ত।
শুল্ক হ্রাসের ফলে রপ্তানি-আমদানি সংস্থাগুলোকে নতুন নীতিমালা অনুযায়ী কাস্টমস ডকুমেন্টেশন আপডেট করতে হবে। এছাড়া, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে শুল্ক হ্রাসের সুবিধা গ্রাহকদের জন্য ঋণ প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে ব্যবসায়িক সম্প্রসারণে আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত হয়।
সামগ্রিকভাবে, খেজুরের শুল্ক হ্রাস বাংলাদেশের ভোক্তা বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং স্থানীয় উৎপাদনকে উত্সাহিত করবে। তবে নীতি বাস্তবায়নের সময় কাস্টমস প্রক্রিয়ার দক্ষতা, লজিস্টিক্সের খরচ এবং বাজারের চাহিদা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। সরকার যদি এই দিকগুলোতে সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়, তবে শুল্ক হ্রাসের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে এবং খেজুরের বাজারে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে।



