ঢাকা, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ – বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মিয়ানমার রাষ্ট্রদূতকে সীমান্তে কোনো উসকানিমূলক কার্যক্রম না করার জন্য কঠোর নোটিশ জারি করেছে। নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সীমান্তে অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা উত্পন্ন করা উভয় দেশের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এই সতর্কবার্তা মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে সাম্প্রতিক সময়ে বাড়তে থাকা উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত হয়েছে।
মিয়ানমার এবং বাংলাদেশ দীর্ঘদিনের সীমান্তে শরণার্থী প্রবাহ, অবৈধ পণ্য পাচার এবং সামরিক চেকপয়েন্টের সমস্যার মুখোমুখি। ২০২১ সালে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বড়ো পরিমাণে বাংলাদেশে প্রবেশের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ বাড়ে চলেছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহে সীমান্তে অস্থায়ী শিবিরে অতিরিক্ত শরণার্থী আগমনের রিপোর্ট পাওয়া যায়, যা দু’দেশের নিরাপত্তা সংস্থাকে অতিরিক্ত সতর্ক করেছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নোটিশে স্পষ্টভাবে মিয়ানমার রাষ্ট্রদূতকে বলেছে যে, সীমান্তে কোনো ধরনের সামরিক চর্চা, অপ্রয়োজনীয় গতি-প্রকৃতি বা রেলপথে অবৈধ পণ্য প্রবাহকে উসকানিমূলক হিসেবে গণ্য করা হবে। মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে যে, এমন কোনো কাজের ফলে উভয় দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরদারির মুখে পড়তে পারে।
মিয়ানমার সরকার নোটিশের পর কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য প্রকাশ করেনি, তবে সীমান্তে নিরাপত্তা বজায় রাখতে উভয় দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বয় বাড়ানোর ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলেন, এই সতর্কবার্তা মিয়ানমার সরকারের সীমান্তে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর পরিকল্পনার প্রতিক্রিয়া হতে পারে, যা পূর্বে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য গৃহীত পদক্ষেপের সঙ্গে সম্পর্কিত।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ রমেশ চৌধুরী উল্লেখ করেন, “মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে উভয় দেশের বাণিজ্যিক রুট ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি হতে পারে।” তিনি আরও বলেন, এই ধরনের কূটনৈতিক সতর্কতা দুই দেশের মধ্যে সংলাপের দরজা বন্ধ না করে বরং সমস্যার সমাধানে আরও কাঠামোগত আলোচনা আহ্বান করে।
সীমান্তে উসকানিমূলক আচরণকে রোধ করার জন্য বাংলাদেশ ইতিমধ্যে সীমান্তের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ বাড়িয়ে তুলেছে। নতুন চেকপয়েন্ট স্থাপন, ড্রোন পর্যবেক্ষণ এবং সীমানা পারাপার নিয়ন্ত্রণের জন্য অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে। একই সঙ্গে, মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে সীমান্তে অপ্রয়োজনীয় সংঘর্ষের সম্ভাবনা কমাতে চাওয়া হয়েছে।
এই সতর্কবার্তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নজর কেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া নীতি বিশেষজ্ঞ অ্যানা গিলম্যান উল্লেখ করেন, “বাংলাদেশের এই পদক্ষেপ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয়, বিশেষ করে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক সংকটের প্রেক্ষাপটে।” তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবিক সংস্থাগুলোর সমর্থন এই ধরনের কূটনৈতিক উদ্যোগকে শক্তিশালী করবে।
মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে অতীতের সংঘর্ষের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ২০১২ সালে সীমান্তে গুলিবর্ষণ এবং ২০২১ সালে শরণার্থী সংকটের সময় উভয় দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছিল। তবে বর্তমান সতর্কবার্তা পূর্বের চেয়ে বেশি স্পষ্ট ও আনুষ্ঠানিক, যা দুই দেশের কূটনৈতিক মঞ্চে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ভূগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, মিয়ানমার ও বাংলাদেশ দু’দেশের সীমান্ত প্রায় ২,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ, যেখানে বহু নদী ও জঙ্গলভূমি অবস্থিত। এই জটিল ভূখণ্ডে নিরাপত্তা বজায় রাখা চ্যালেঞ্জপূর্ণ, তাই উভয় দেশের নিরাপত্তা সংস্থার সমন্বিত কাজ প্রয়োজন। সীমান্তে অবৈধ পণ্য প্রবাহ ও মানব পাচার রোধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোও জরুরি।
পরবর্তী সময়ে দু’দেশের কূটনৈতিক মিটিংয়ের সময় এই বিষয়টি আলোচনার মূল বিষয় হিসেবে উঠে আসবে বলে আশা করা যায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, আগামী মাসে দু’দেশের উচ্চপদস্থ কূটনীতিকদের মধ্যে সরাসরি আলোচনা হবে, যেখানে সীমান্তে নিরাপত্তা, শরণার্থী পুনর্বাসন এবং বাণিজ্যিক সহযোগিতা নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা গৃহীত হবে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, এই ধরনের কূটনৈতিক সতর্কতা যদি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে সীমান্তে উত্তেজনা কমে যাবে এবং মানবিক সংকটের মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা সহজ হবে। তবে সতর্কবার্তা সত্ত্বেও যদি উসকানিমূলক কাজ অব্যাহত থাকে, তবে তা কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি এবং সম্ভাব্য সামরিক সংঘর্ষের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
সারসংক্ষেপে, বাংলাদেশ মিয়ানমার রাষ্ট্রদূতকে সীমান্তে উসকানিমূলক আচরণ না করার জন্য কঠোর নোটিশ জারি করেছে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ওপর প্রভাব ফেলবে। উভয় দেশের কূটনৈতিক সংলাপ ও নিরাপত্তা সমন্বয় এই সতর্কবার্তার কার্যকারিতা নির্ধারণে মূল ভূমিকা রাখবে।



