পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) জুলাই ২০২৩-এ গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় শেখ হাসিনাসহ মোট ১১৩ জনকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করেছে। এই সুপারিশের পেছনে মূল অভিযুক্ত সাহেদ আলীর অস্তিত্বই না পাওয়া এবং মামলায় উল্লেখিত তথ্যের ত্রুটি রয়েছে।
মামলাটি ধানমন্ডি থানার ১ নং রেজিস্ট্রেশন, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে দাখিল হয়। শিকারের নাম সাহেদ আলী, যাকে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। তবে পিবিআই তদন্তে দেখা যায়, উল্লেখিত ঠিকানায় কখনোই সাহেদ আলী নামে কোনো ব্যক্তি বাস করেননি।
তদুপরি, শিকারের পরিচয়পত্রও ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে; এতে কোনো মোবাইল নম্বর নিবন্ধিত নেই এবং প্রমাণিত হয়েছে যে শিকারের পরিবারিক সম্পর্কও বাদীর সঙ্গে নেই। বাদীর ভাই হিসেবে শিকারের উল্লেখও ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
শিকারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে সীমান্ত স্কয়ার মার্কেট কমিটির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও, কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা সিটি কলেজের অধ্যক্ষদের লিখিত বিবৃতি থেকে জানা যায় যে, মামলায় উল্লেখিত ছাত্র-ছাত্রীদের পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা না থাকায় তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা কঠিন হয়েছে।
পিবিআই পরিদর্শক শাহজাহান ভূঁইয়া ৫ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় উল্লেখ করেন, মামলায় তথ্যগত ভুলের কারণে শিকারের অস্তিত্বই না পাওয়া এবং শিকারের পরিচয়পত্রের ভুয়া হওয়াকে মূল কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
এই চূড়ান্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে পিবিআই ১১৩ জনকে, যার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সভাপতি অন্তর্ভুক্ত, অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, শিকারের হদিস না পাওয়া এবং তথ্যের ত্রুটির কারণে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
মামলার পরবর্তী শোনানি ৩ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত হয়েছে। আদালত এই শোনানিতে পিবিআইয়ের সুপারিশ গ্রহণ করবে কিনা তা নির্ধারণ করবে।
পিবিআই এই সিদ্ধান্তের পর মিডিয়ার ব্যাপক আগ্রহের মুখে একটি ব্যাখ্যামূলক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, মামলাটি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় দায়ের করা হয়েছিল এবং সংবাদ শিরোনামগুলোতে অতিরিক্ত কৌতুহল সৃষ্টি হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, শিকারের নামের পরিবর্তে বাদীর নাম শরিফ (৩৭) হিসেবে দায়ের করা হয়েছিল, যার বাবার নাম সিরাজ এবং তিনি ট্যানারি এলাকায় বাস করতেন। তবে তদন্তে দেখা গেছে, বাদীর এবং শিকারের মধ্যে কোনো পারিবারিক সম্পর্ক নেই।
পিবিআইয়ের অনুসন্ধানে শিকারের পরিচয়পত্রের নকল হওয়া এবং তার ব্যবসা সংক্রান্ত তথ্যের অনুপস্থিতি উভয়ই স্পষ্ট হয়েছে। এই বিষয়গুলো মামলায় উল্লেখিত প্রমাণের বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, পিবিআইয়ের এই সুপারিশ সরকার ও বিরোধী গোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনা বাড়াতে পারে, বিশেষ করে যখন প্রধানমন্ত্রীর নামও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে পিবিআই জোর দিয়ে বলেছে, সুপারিশের ভিত্তি সম্পূর্ণভাবে তথ্যগত ত্রুটির ওপর।
মামলাটি মূলত ২০২৩ সালের জুলাই মাসে ঘটিত গণঅভ্যুত্থানের সময়ের একটি হত্যাচেষ্টা হিসেবে দায়ের হয়েছিল, কিন্তু তদন্তের ফলাফল দেখায় যে মূল শিকারের অস্তিত্বই না পাওয়া। এই বাস্তবতা মামলাটিকে আইনগতভাবে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।
পরবর্তী শোনানিতে আদালত পিবিআইয়ের সুপারিশ গ্রহণ করবে কিনা তা নির্ধারণের পাশাপাশি, মামলায় উল্লেখিত তথ্যের ত্রুটি কীভাবে সংশোধন করা হবে তা নিয়ে নির্দেশনা দিতে পারে। এই সিদ্ধান্তের ফলে রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন গতিবিধি দেখা দিতে পারে।
সারসংক্ষেপে, পিবিআই শিকারের অস্তিত্ব না পাওয়া, পরিচয়পত্রের নকল এবং তথ্যের ত্রুটির ভিত্তিতে ১১৩ জনকে, যার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অন্তর্ভুক্ত, অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করেছে। মামলার চূড়ান্ত রায়ের জন্য ৩ ফেব্রুয়ারি শোনানি নির্ধারিত, যা দেশের রাজনৈতিক ও আইনি পরিপ্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।



