অন্তর্বর্তী সরকার ১ কোটি লিটার পরিশোধিত সয়াবিন তেল ক্রয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যার মোট ব্যয় প্রায় ১৮১ কোটি টাকা। এই সিদ্ধান্তটি মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে অনুমোদিত হয়। বৈঠকের সভাপতিত্ব করেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, যিনি তেল সরবরাহের প্রয়োজনীয়তা ও বাজেটের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন।
বৈঠকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব অনুসারে, তেলটি জাতীয় উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে ক্রয় করা হবে। দরপত্রের ফলস্বরূপ সুপারিশপ্রাপ্ত দরদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঢাকা সোনারগাঁও সিডস ক্রাশিং মিলস লিমিটেড নির্বাচিত হয়েছে। এই কোম্পানি পূর্বে তেল শোধন ও রপ্তানিতে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, ফলে সরকার তার সক্ষমতা কাজে লাগাতে চায়।
প্রস্তাবিত চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, প্রতি লিটারে তেলের দাম নির্ধারিত হয়েছে ১৮০ টাকা ৮৫ পয়সা। মোট ১ কোটি লিটার ক্রয়ের ফলে মোট ব্যয় ১৮০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা হিসেবে গণনা করা হয়েছে, যা সরকারী বাজেটের উল্লেখযোগ্য অংশ গঠন করে। তেলটি সরাসরি শোধনাগার থেকে সংগ্রহ করে বিতরণ চেইনে প্রবেশ করানো হবে, ফলে মধ্যস্থতাকারী খরচ কমে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সয়াবিন তেলের এই বৃহৎ পরিমাণের ক্রয় দেশীয় তেল বাজারে সরবরাহ বাড়াবে। বর্তমানে দেশীয় তেল উৎপাদন চাহিদা পূরণে ঘাটতি রয়েছে, ফলে আমদানি নির্ভরতা বেশি। সরকারী ক্রয় স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করে, আমদানি চাপ কমাতে সহায়তা করবে এবং বাজারে মূল্য স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখবে। তদুপরি, তেল সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত হলে রেস্তোরাঁ, হোটেল ও গৃহস্থালী ব্যবহারকারীদের জন্য মূল্যস্ফীতি কমতে পারে।
বাজেটের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, ১৮১ কোটি টাকার এই ব্যয় আর্থিক পরিকল্পনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে। যদিও তেল ক্রয় দীর্ঘমেয়াদে আমদানি খরচ কমিয়ে বাজেটের ভার হ্রাস করতে পারে, তবু স্বল্পমেয়াদে নগদ প্রবাহে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তাই সরকারকে তেল ক্রয়ের পাশাপাশি আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও তহবিলের সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে।
একই বৈঠকে সয়াবিন তেল ক্রয়ের পাশাপাশি সার আমদানির প্রস্তাবও অনুমোদিত হয়। সার আমদানির মাধ্যমে কৃষকদের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে, যা ফসলের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়ক। তেল ও সার উভয়ের ক্রয় একসঙ্গে করা হলে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা উভয় ক্ষেত্রেই সমন্বিত উন্নতি আশা করা যায়।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, তেল ক্রয়ের ফলে দেশীয় তেল শিল্পের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি সম্ভাবনা উন্মুক্ত হতে পারে। তবে তেলের আন্তর্জাতিক দামের ওঠানামা, মুদ্রা বিনিময় হার এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের অস্থিরতা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারকে চুক্তির শর্তে মূল্য সমন্বয় ক্লজ যুক্ত করা এবং সরবরাহকারীর আর্থিক স্থিতিশীলতা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
ভবিষ্যতে তেল ক্রয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সরকারকে স্থানীয় শোধনাগারগুলোর আধুনিকীকরণে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তেল উৎপাদনের দক্ষতা ও গুণগত মান উন্নত হলে আমদানি নির্ভরতা কমে যাবে এবং বাজেটের উপর চাপ হ্রাস পাবে। এছাড়া, তেল ও সারের সমন্বিত ক্রয় নীতি কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা দুটোই শক্তিশালী করবে বলে ধারণা করা যায়।
সংক্ষেপে, সরকারী ১ কোটি লিটার সয়াবিন তেল ক্রয় দেশীয় তেল সরবরাহ বাড়িয়ে বাজারের মূল্য স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে, তবে বাজেটের উপর আর্থিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা মোকাবিলার জন্য সতর্ক পরিকল্পনা প্রয়োজন। তেল ও সার উভয়ের সমন্বিত ক্রয় নীতি কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।



