ঢাকা মেট্রোপলিটন গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গোষ্ঠী গঠন করে আর্থিক প্রতারণা চালানোর অভিযোগে পাঁচজন চীনা নাগরিকসহ মোট আটজনকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারের সময় ডিবি জানিয়েছে, সন্দেহভাজনরা চাকরি প্রদান, উচ্চ মুনাফার বিনিয়োগ এবং সস্তা পণ্যের বিজ্ঞাপন ব্যবহার করে সাধারণ নাগরিকদের থেকে টাকা আদায় করছিল।
গ্রেফতারকৃতদের নাম প্রকাশিত হয়েছে: চেন লিং ফেং, জেং কং, জেং চাংকিয়াং, ওয়েন জিয়ান কিউ, হুয়াং ঝেং জিয়াং, মো. জাকারিয়া, নিয়াজ মাসুম এবং ওকামরুল হাসান (হাসান জয়)। ঢাকার বসুন্ধরা ও উত্তরা এলাকায় গৃহ অনুসন্ধান চালিয়ে পুলিশ এই আটজনকে আটক করেছে। অনুসন্ধানের সময় ৫১,২৫১টি সিম কার্ড, ৫১টি মোবাইল ফোন এবং ২১টি ভিওআইপি গেটওয়ে সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।
ডিবি-সাইবার ও স্পেশাল ক্রাইম উত্তর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাসের রিকাবদার জানিয়েছেন, টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গোষ্ঠী গঠন করে তারা টার্গেট ব্যক্তিদের ফাঁদে ফেলে মোবাইল ব্যাংকিং ও অনলাইন ব্যাংকিং সিস্টেমের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর করাত। তিনি উল্লেখ করেন, “প্রতারণার পদ্ধতি ছিল বহুমুখী; কখনো চাকরির প্রতিশ্রুতি, কখনো লাভজনক বিনিয়োগের প্রলোভন, আবার কখনো সস্তা পণ্যের চটকদার বিজ্ঞাপন।”
অধিক তদন্তে জানা গেছে, গ্রেফতারকৃত চীনা নাগরিকদের ভিসা ও প্রবেশের তথ্য এখনও যাচাই করা হচ্ছে। নাসের রিকাবদার জানান, “সিম কার্ডের উৎস ও সেগুলো কীভাবে সরবরাহ করা হয়েছে তা আমরা বিশদে অনুসন্ধান করছি।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, “প্রতিবেদন অনুযায়ী, সন্দেহভাজনরা মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ ব্যবহার করে শিকারদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করত এবং তা দ্রুত অন্য অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করত।”
এই মামলার সঙ্গে পূর্বে ৭ জানুয়ারি উত্তরা থেকে দুইজন চীনা নাগরিককে গ্রেফতার করার পর ডিবি যে তথ্য প্রকাশ করেছিল, তা পুনরায় উন্মোচিত হয়েছে। সেই সময়ে সন্দেহভাজনরা বিদেশ থেকে আনা মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ দিয়ে অবৈধভাবে আইফোন সংযোজন করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করছিল। তদুপরি, ৩০৫টি মোবাইল ফোন এবং আইফোনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, পাশাপাশি সংযোজনের মেশিনারিজও তদনুযায়ী বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল।
ডিবি এই বিষয়গুলোকে ‘দেশি-বিদেশি প্রতারক চক্র’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং তদন্তের পরিধি বাড়িয়ে সিম কার্ডের সরবরাহ শৃঙ্খলা, মোবাইল ফোনের অবৈধ আমদানি এবং অনলাইন আর্থিক লেনদেনের পদ্ধতি বিশ্লেষণ করছে। নাসের রিকাবদার উল্লেখ করেন, “প্রতারণা বন্ধ করতে আমাদেরকে প্রযুক্তিগত দিক থেকে সিম কার্ডের মূল উৎস ও বিতরণ চ্যানেল চিহ্নিত করতে হবে।”
গ্রেফতারকৃত আটজনের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে এবং তাদের আদালতে উপস্থাপন করা হবে। ডিবি অনুসারে, মামলার পরবর্তী ধাপগুলোতে অপরাধের প্রকৃতি, জড়িত আর্থিক পরিমাণ এবং আন্তর্জাতিক সংযোগের ভিত্তিতে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া, সংশ্লিষ্ট চীনা নাগরিকদের ভিসা ও প্রবেশের বৈধতা যাচাই করার পাশাপাশি, ভবিষ্যতে অনুরূপ প্রতারণা রোধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এই ঘটনার পর, ডিবি-সাইবার ইউনিট অনলাইন প্রতারণা মোকাবিলায় বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন করেছে এবং সামাজিক মাধ্যমে গোষ্ঠী গঠন, সিম কার্ডের অবৈধ বাণিজ্য এবং মোবাইল ব্যাংকিং সিস্টেমের দুর্বলতা দূর করার জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি কর্মসূচি চালু করবে। জনসাধারণকে সতর্ক করা হয়েছে, অনলাইন চাকরি, বিনিয়োগ বা সস্তা পণ্যের অফার গ্রহণের আগে প্রমাণ যাচাই করে পদক্ষেপ নিতে।
প্রতারণা মামলায় জড়িত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি তীব্রতা বজায় রাখবে এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো শক্তিশালী করবে।



