সোমবার গাজা উপত্যকার দক্ষিণে অবস্থিত খান ইউনিস শহরে ইসরায়েল সমর্থিত একটি ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী দাবি করেছে, তারা হামাসের নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ এক উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাকে গুলি করে হত্যা করেছে। নিহত ছিলেন মাহমুদ আল‑আস্তাল, যিনি অপরাধ তদন্ত বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করতেন।
হামাসের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের একটি বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আল‑আস্তালকে একটি চলমান গাড়ি থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। গোষ্ঠীটি হামাসের বিবৃতিতে ইসরায়েলি সহযোগীদের কাজ বলে অভিযুক্ত করেছে এবং নিজেদেরকে ‘দখলদারদের সহযোগী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
আস্তালের মৃত্যু সম্পর্কে রোয়টার্সের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবে ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তার মন্তব্যে বলা হয়েছে, ওই এলাকায় কোনো সামরিক অভিযান সম্পর্কে তারা অবগত নয়। এই অনিশ্চয়তা গাজার জটিল নিরাপত্তা পরিবেশকে আরও অস্বচ্ছ করে তুলেছে।
হামাসের বিরুদ্ধে সশস্ত্র গোষ্ঠীর উদ্ভব গাজার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিবিদ্যাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সক্রিয় হওয়ায় হামাসের একতাবদ্ধতা ও শাসন ক্ষমতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। যদিও গোষ্ঠীগুলো প্রকাশ্যে দাবি করে যে তারা ইসরায়েলের নির্দেশে কাজ করে না, তবু তাদের উপস্থিতি গাজার রাজনৈতিক দৃশ্যকে বিভক্ত করে তুলছে।
হামাস পূর্বে যাদের ‘সহযোগী’ বলে চিহ্নিত করেছে, তাদের ওপর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। এই ধরনের শাস্তি গাজার জনমতকে আরও জটিল করে তুলেছে, কারণ গোষ্ঠীগুলো স্থানীয় জনগণের মধ্যে জনপ্রিয় নয় এবং ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে তাদের কার্যক্রম সীমিত।
অক্টোবর মাসে গৃহীত যুদ্ধবিরতির পর ইসরায়েল গাজার প্রায় অর্ধেক এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহার করেছে, তবে অবশিষ্ট অংশে এখনও তার নিয়ন্ত্রণ বজায় রয়েছে। এই অংশটি মূলত ধ্বংসাবশেষে পরিণত, যেখানে অধিকাংশ ভবনই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।
গাজার প্রায় ২০ লক্ষ মানুষ এখন হামাসের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকায় বসবাস করছে; অধিকাংশই অস্থায়ী তাঁবু বা ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িতে। গৃহযুদ্ধের পরেও হামাস দাবি করে, তারা হাজার হাজার যোদ্ধাকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে এবং সংগঠনটির সামরিক কাঠামো এখনও কার্যকর।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের নীতি অনুযায়ী, তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় হামাসের প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলোকে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। এই কৌশল গাজার নিরাপত্তা গঠনকে আরও জটিল করে তুলছে, কারণ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষের সম্ভাবনা বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপে ইসরায়েলি সেনা আরও প্রত্যাহার এবং আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থিত প্রশাসনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা বলা হয়েছিল, তবে এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই অগ্রগতির অভাবকে গাজার স্থিতিশীলতা অর্জনে বাধা হিসেবে দেখছেন।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জুন মাসে প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ইসরায়েল গাজার ভিতরে হামাসবিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন করবে। এই মন্তব্য গাজার নিরাপত্তা পরিবেশে ইসরায়েলি হস্তক্ষেপের নতুন মাত্রা নির্দেশ করে এবং গাজার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামোর উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দেন, গাজার নিরাপত্তা গঠন পুনর্গঠনের জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিশেষ করে জাতিসংঘের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী কয়েক মাসে গাজার পুনর্গঠন, মানবিক সহায়তা এবং রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য নির্দিষ্ট মাইলস্টোন নির্ধারিত হতে পারে, যার মধ্যে গাজার উত্তর ও দক্ষিণে নিরাপত্তা জোনের স্থাপন এবং পুনরায় নির্বাচনের সময়সূচি অন্তর্ভুক্ত।
গাজার বর্তমান পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে; যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আরব দেশগুলো গাজার মানবিক সংকট সমাধানে সমন্বিত পদক্ষেপের আহ্বান জানাচ্ছে। গাজার নিরাপত্তা গঠন, মানবিক সহায়তা এবং রাজনৈতিক পুনর্গঠন একসঙ্গে অগ্রসর না হলে গাজার দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন হবে।



