ঢাকা, ১৩ জানুয়ারি – বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার মিয়ানমার রাষ্ট্রদূত কিয়াউ সোয়ে মোকে তলব করেছে, কারণ সীমান্তের ওপার থেকে গুলি চালিয়ে টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ৯ বছর বয়সী হুজাইফা আফনানকে গুরুতরভাবে আহত করা হয়েছে। একই সময়ে, গত সোমবারের একটি মাইন বিস্ফোরণে ২৮ বছর বয়সী মো. হানিফের বাঁ পা উড়ে গিয়েছিল। উভয় ঘটনার ফলে দুইটি পরিবার শোক ও চিকিৎসা সহায়তার মুখোমুখি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অপ্ররোচিত গুলিবর্ষণ আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে বাধা সৃষ্টি করে। মন্ত্রণালয় জোর দিয়ে বলেছে, মিয়ানমারকে সম্পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করে ভবিষ্যতে এমন কোনো অনধিকারিক পারাপার বন্ধ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
আফনান, যিনি টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তেচ্ছিব্রিজ সীমান্ত এলাকায় বাস করেন, গুলিবর্ষণের পর চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়। তার শারীরিক অবস্থা এখনও সংকটাপন্ন, মাথার খুলি খুলে রাখা হয়েছে এবং চিকিৎসা বোর্ডের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। গুলির সঠিক উৎস ও দায়িত্ব সম্পর্কে তদন্ত চলছে।
গতকাল, একই সীমান্ত অঞ্চলে একটি স্থলমাইন বিস্ফোরণ ঘটায়, যার ফলে ২৮ বছর বয়সী মো. হানিফের বাঁ পা উড়ে যায়। হানিফের আহত অংশটি তীব্র রক্তক্ষরণ ও হাড় ভাঙ্গার কারণে তৎক্ষণাৎ শল্যচিকিৎসা করা হয়। তার অবস্থা স্থিতিশীল, তবে পুনর্বাসনের জন্য দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক থেরাপি প্রয়োজন হবে।
মিয়ানমার রাষ্ট্রদূত কিয়াউ সোয়ে মো তলবের পর দ্রুতই একটি বিবৃতি প্রকাশ করে, যেখানে তিনি ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে তার সরকার যথাযথ ব্যবস্থা নেবে বলে আশ্বাস দেন। এছাড়া, আফনান ও হানিফের পরিবারকে গভীর সমবেদনা জানিয়ে, আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের ফলে সশস্ত্র গোষ্ঠী সীমান্ত পারাপার করে গুলি ও মাইন ব্যবহার করা একটি বাড়তে থাকা প্রবণতা। এই ধরনের অপ্রত্যাশিত হামলা বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলছে এবং স্থানীয় বাণিজ্য ও মানবিক চলাচলকে বাধাগ্রস্ত করছে।
এ ধরনের ঘটনা পূর্বে ২০২৩ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাগেরা অঞ্চলে গুলিবর্ষণের মাধ্যমে ঘটেছিল, যেখানে কয়েকজন বাংলাদেশি কৃষক আহত হয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও ASEAN সদস্য দেশগুলো এই ধরনের সীমান্ত অতিক্রমকারী সহিংসতা নিয়মিতভাবে নিন্দা করে এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানায়।
বাংলাদেশের তলবের মূল দাবি হল মিয়ানমারকে সম্পূর্ণ দায়িত্ব স্বীকার করে, সীমান্তে অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার বন্ধ করতে এবং ভবিষ্যতে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী বা অপ্রতিবন্ধিত গুলিবর্ষণ ঘটতে না দেয়ার জন্য কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে। এছাড়া, উভয় দেশের নিরাপত্তা সংস্থার সমন্বয়ে যৌথ পর্যবেক্ষণ দল গঠন করা একটি সম্ভাব্য পদক্ষেপ হিসেবে উল্লিখিত হয়েছে।
বিশ্ব মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলের সদস্য দেশগুলোও এই ঘটনার প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করে, এবং উভয় পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে দায়িত্বশীল আচরণ বজায় রাখতে আহ্বান জানায়। পরবর্তী সপ্তাহে ঢাকা ও রাখাইন উভয় দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক নির্ধারিত হয়েছে, যেখানে সীমান্ত নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা ও শরণার্থী সমস্যার সমাধান নিয়ে আলোচনা হবে।
সারসংক্ষেপে, গুলিবর্ষণ ও মাইন বিস্ফোরণের ফলে আহত শিশু ও যুবকের কষ্টের পাশাপাশি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও চাপ সৃষ্টি হয়েছে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবেশী সম্পর্ক বজায় রাখতে উভয় পক্ষের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজন, যাতে সীমান্তে আর কোনো বেসামরিক নাগরিকের জীবন ও জীবিকার ওপর প্রভাব না পড়ে।



