অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই‑আগস্ট ২০২২ সালের গণ‑অভ্যুত্থানের অংশগ্রহণকারীদের জন্য আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একটি অধ্যাদেশের খসড়া তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়কে এই খসড়া প্রস্তুত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়টি ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা‑সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে অনুমোদিত হয়।
দায়মুক্তি বলতে রাষ্ট্রের বিশেষ আইন বা আদেশের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সংগঠনকে তাদের অতীতের কোনো কর্মকাণ্ডের জন্য বিচারিক প্রক্রিয়া থেকে রক্ষা করা বোঝায়। সাধারণত যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ বা বৃহৎ জনসাধারণের আন্দোলনের পর এই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যাতে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা, জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সহজ হয়। তবে অতিরিক্ত ব্যবহার বা অপব্যবহার হলে আইনি ন্যায্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
জুলাই ২০২২‑এর গণ‑অভ্যুত্থানের পর থেকে দায়মুক্তি দাবির স্রোত দীর্ঘদিন ধরে চলেছে। গত বছর অক্টোবর মাসে অন্তর্বর্তী সরকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি আদেশ জারি করে, যেখানে ১৫ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত সংঘটিত ঘটনাগুলোর জন্য কোনো মামলা, গ্রেপ্তার বা হস্তক্ষেপ করা যাবে না বলে নির্দেশ দেওয়া হয়। একই বছর ৫ আগস্ট প্রকাশিত জুলাই ঘোষণাপত্রে বলা হয়, “বাংলাদেশের জনগণ জুলাই গণ‑অভ্যুত্থানের শহীদদের জাতীয় বীর হিসেবে ঘোষণা করে এবং তাদের পরিবার, আহত যোদ্ধা ও আন্দোলনকারী ছাত্র‑জনতাকে প্রয়োজনীয় আইনি সুরক্ষা প্রদান করার ইচ্ছা প্রকাশ করে।”
সাম্প্রতিক সময়ে দুইটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা এই বিষয়কে পুনরায় আলোচনার মুখে এনেছে। ২৫ ডিসেম্বর, হাবিগঞ্জের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মাহদী হাসানকে গ্রেপ্তার করা হয়, এবং এক দিন পরই ১১ দিন পর, তহরিমা জান্নাত সুরভীকে গ্রেপ্তার করা হয়। উভয় ব্যক্তিই জুলাই‑আগস্টের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগে আটক হয়। এই গ্রেপ্তারের পর থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো দায়মুক্তি আদেশের বাস্তবায়ন ও পুনর্বিবেচনার দাবি জানাচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের পদক্ষেপের পেছনে মূল লক্ষ্য হল পূর্বের আদেশের আইনি ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং সম্ভাব্য আইনি চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করা। আইন মন্ত্রণালয়কে খসড়া প্রস্তুত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো আদালত বা অন্যান্য সংস্থা এই বিষয়ে প্রশ্ন তুললে স্পষ্ট আইনি কাঠামো উপস্থাপন করা যায়। সরকার এই উদ্যোগকে “জাতীয় ঐক্য ও পুনর্গঠনকে সমর্থনকারী পদক্ষেপ” হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
প্রতিপক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, কিছু রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার কর্মীরা এই ধরণের দায়মুক্তি ব্যবস্থা সমালোচনা করে, কারণ এটি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে অব্যাহতি দিতে পারে এবং আইনের শাসনকে দুর্বল করতে পারে। অন্যদিকে, আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীরা দাবি করে যে, তাদের ওপর আরোপিত আইনি চাপ তাদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে এবং অতীতের রাজনৈতিক দমনকে পুনরাবৃত্তি করে।
অধিকন্তু, এই পদক্ষেপের ফলে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন গতিপথ গঠিত হতে পারে। যদি সরকার সফলভাবে দায়মুক্তি অধ্যাদেশ জারি করে, তবে এটি ভবিষ্যতে সমান ধরনের আন্দোলনের জন্য একটি রেফারেন্স পয়েন্ট হতে পারে, যা রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশল ও জনমত গঠনে প্রভাব ফেলবে। অন্যদিকে, যদি আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে বাধা পায়, তবে সরকারকে পুনরায় সমন্বয় করতে হতে পারে এবং এটি রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে।
সারসংক্ষেপে, অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই‑আগস্টের আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদের জন্য দায়মুক্তি অধ্যাদেশের খসড়া প্রস্তুত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে রূপায়িত হবে। এই পদক্ষেপের পেছনে অতীতের আদেশকে শক্তিশালী করা এবং ভবিষ্যতে আইনি বিরোধ এড়ানোই মূল উদ্দেশ্য। তবে এটি রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া উত্পন্ন করেছে, এবং দেশের রাজনৈতিক গতিপথে কী প্রভাব ফেলবে তা সময়ই নির্ধারণ করবে।



