২০১৬ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত, আওয়ামী লীগ শাসনকালে জাতীয় টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (NTMC), পুলিশ এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (Rab) সম্মিলিতভাবে ১,৩৮২ কোটি টাকারও বেশি গোপন নজরদারি সরঞ্জাম ক্রয় করেছে বলে সরকারী আমদানি রেকর্ড প্রকাশ করেছে। এই ক্রয়গুলো দেশের টেলিকম ও ইন্টারনেট নেটওয়ার্কে ব্যাপক পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।
NTMC ২০১৬ সালে “ইন্টিগ্রেটেড লফুল ইন্টারসেপশন সিস্টেম” (ILIS) নামে একটি সমন্বিত কাঠামো গড়ে তুলেছে, যা জাতীয় ইন্টারনেট ও টেলিকম ট্র্যাফিককে রিয়েল‑টাইমে আটক, ডিক্রিপ্ট, বিশ্লেষণ এবং সংরক্ষণ করতে সক্ষম। কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টার থেকে একাধিক সংস্থা একসাথে ডেটা পর্যবেক্ষণ করতে পারে, ফলে সাইবার হুমকি থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধী সনাক্তকরণে সহায়তা করা সম্ভব।
সরকারি আমদানি ডেটা এবং একাধিক চুক্তি অনুসারে, ২০১৬‑২০২৪ সময়কালে NTMC, পুলিশ ও Rab মোট ১,৩৮২ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের নজরদারি সরঞ্জাম সংগ্রহ করেছে। এই পরিমাণে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন IMSI ক্যাচার, জ্যামার, গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (GPS) ট্র্যাকার, স্যাটেলাইট যোগাযোগ বিশ্লেষক, স্পিকার রিকগনিশন সিস্টেম এবং এনক্রিপ্টেড ডেটা হস্তক্ষেপের জন্য ম্যান‑ইন‑দ্য‑মিডল (MITM) টুল।
Rab-এ বিশেষভাবে লক্ষ্যভিত্তিক নজরদারি সরঞ্জাম কেনা হয়েছে। রেকর্ডে দেখা যায়, তারা ব্যাকপ্যাক‑ধরনের IMSI ক্যাচার, মোবাইল ও গাড়ি‑মাউন্টেড জ্যামার, এবং মোবাইল যোগাযোগ বিশ্লেষক ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ব্যক্তির সিগন্যাল ব্লক ও পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম। এসব ডিভাইসের মাধ্যমে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুদের ফোন কল, এসএমএস এবং ডেটা ট্র্যাফিক রিয়েল‑টাইমে ধরা সম্ভব।
পুলিশের ক্রয় তালিকায় আরও বিস্তৃত ট্যাকটিক্যাল সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত। উচ্চমানের IMSI ক্যাচার, GPS ট্র্যাকার, স্যাটেলাইট যোগাযোগ বিশ্লেষক, স্পিকার রিকগনিশন সিস্টেম এবং এনক্রিপ্টেড যোগাযোগে হস্তক্ষেপের সক্ষমতা সম্পন্ন ম্যান‑ইন‑দ্য‑মিডল টুলের পাশাপাশি স্পাইওয়্যার ইনজেকশন করার সক্ষমতা যুক্ত ডিভাইস রয়েছে। এসব সরঞ্জাম একাধিক অপরাধমূলক তদন্তে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানা যায়।
উল্লেখযোগ্য যে, উপরে উল্লেখিত সরঞ্জামের তালিকা ও মোট মূল্য সীমিত ডেটাসেটের উপর ভিত্তি করে তৈরি। শুধুমাত্র নির্দিষ্ট হারমোনাইজড সিস্টেম (HS) কোডের অধীনে রেকর্ড করা আমদানি তথ্যই বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে; অনুরূপ পণ্যগুলো অন্য কোডে রেকর্ড হয়ে থাকতে পারে, যা এই প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হয়নি।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, যদিও নজরদারি ব্যবস্থা অপরাধ প্রতিরোধ, গোয়েন্দা সংগ্রহ এবং জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তবু স্বচ্ছতা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া এই ধরনের শক্তিশালী সিস্টেমের অপব্যবহার রাজনৈতিক বিরোধীকে দমন করা এবং গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, সরকার যদি এই সরঞ্জামগুলোকে স্বচ্ছতা ছাড়া ব্যবহার চালিয়ে যায়, তবে নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর চাপ বাড়বে। ভবিষ্যতে আদালত ও সংসদীয় তদারকি কীভাবে গঠন করা হবে, তা নির্ধারণ করবে এই নজরদারি নেটওয়ার্কের সীমা ও ব্যবহার।
সারসংক্ষেপে, ২০১৬‑২০২৪ সময়কালে সরকারী সংস্থাগুলো বিশাল পরিমাণে গোপন নজরদারি সরঞ্জাম সংগ্রহ করেছে, যার মাধ্যমে জাতীয় ইন্টারনেট ও টেলিকম নেটওয়ার্কে ব্যাপক পর্যবেক্ষণ সম্ভব। এই অবস্থা নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার মধ্যে সূক্ষ্ম সমতা রক্ষার জন্য স্বচ্ছতা, আইনি তদারকি এবং জনসাধারণের সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।



