জাতীয় নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮, ২০২৪) তদন্ত কমিশন গতকাল রাষ্ট্রের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনুসের কাছে একটি বিশদ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেষ তিনটি জাতীয় নির্বাচন সর্বোচ্চ স্তরের সরকারি হস্তক্ষেপে পরিচালিত হয়েছে; প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলি সমন্বিতভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যুক্ত ছিল।
কমিশনের মতে, ঐ নির্বাচনের সময় নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ নির্বাচন কমিশন থেকে দূরে সরে প্রশাসনের হাতে চলে যায়। নির্বাচন পরিচালনায় প্রশাসনই মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে, আর স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা হ্রাস পায়।
কমিশনটি ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তদন্তের সময় এই ফলাফল প্রকাশ করেছে। এছাড়া, ২০০৮ সালের নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তদন্তের পরিধি বাড়িয়ে নেওয়ার এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
এই পাঁচ সদস্যের কমিশনের নেতৃত্বে ছিলেন বিচারপতি শামিম হাসনাইন। অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন শামিম আল মামুন (প্রাক্তন অতিরিক্ত সচিব), কাজি মাহফুজুল হক (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক), আইনজীবী তাজরিয়ান আকরাম হুসেইন এবং নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আবদুল আলিম।
প্রতিবেদনটি বিকালবেলায় জামুনা স্টেট গেস্ট হাউসে উপদেষ্টা ইউনুসের হাতে পৌঁছায়। প্রতিবেদন গ্রহণের পর, উপদেষ্টা ইউনুস উল্লেখ করেন যে ভোট জালিয়াতির কথা আগে থেকেই শোনা গিয়েছিল, তবে পুরো প্রক্রিয়া এতটা বিকৃত হয়েছে যে ফলাফল কাগজে লিখে দেয়া হয়েছে যেন ইচ্ছামতো। তিনি বলেন, এই তথ্য জাতির সামনে উপস্থাপন করা জরুরি, যাতে পুরো প্রক্রিয়ার নথি সংরক্ষিত থাকে।
উপদেষ্টা ইউনুস আরও জোর দিয়ে বলেন, জনগণ এই নির্বাচনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তাদের কোনো বিকল্প ছিল না। তিনি দাবি করেন, দায়ী সকলের পরিচয় উন্মোচন করা দরকার, কীভাবে তারা এই কাজটি সম্পন্ন করেছে তা জানার প্রয়োজন, এবং ভবিষ্যতে এমন কোনো নির্বাচন চুরি না হয় তা নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নিতে হবে।
কমিশনের প্রতিবেদনে ২০১৪ সালের নির্বাচনের সময় নির্দিষ্ট কিছু ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, তবে সম্পূর্ণ বিশদ এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তবু, প্রতিবেদনের মূল বার্তা স্পষ্ট: নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতা বজায় রাখতে তৎক্ষণাৎ সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এই প্রতিবেদনের প্রকাশের পর, বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো থেকে প্রত্যাশা বাড়ছে যে তদন্তের পরিধি বিস্তৃত হবে এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত হবে।
অধিকন্তু, নির্বাচন কমিশনের স্বতন্ত্রতা পুনরুদ্ধার এবং ভবিষ্যতে নির্বাচন পরিচালনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকারী ও স্বশাসিত সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়ার ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করা হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে, আইনসভার সদস্য ও বিচারিক সংস্থাগুলোকে তদন্তের পরিধি বাড়িয়ে ২০০৮ থেকে বর্তমান পর্যন্ত সব নির্বাচনের ওপর পুনরায় নজর দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে, নির্বাচনী আইনের সংশোধন ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার শক্তিশালীকরণে কাজ করা হবে।
জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশনের এই পদক্ষেপকে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে নির্বাচনকে সত্যিকারের জনগণভিত্তিক এবং স্বচ্ছ করতে সকল স্তরে সমন্বিত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হবে।



