বাংলাদেশের রপ্তানি খাত পাঁচ মাস ধারাবাহিকভাবে আয় হ্রাসের মুখে। উদ্যোক্তাদের মতে, একই সময়ে গত বছরের তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে, এবং জুনের শেষ পর্যন্ত এই প্রবণতা বদলাবে বলে আশা করা কঠিন।
রপ্তানি দেশের মুদ্রা রিজার্ভ, আমদানি সক্ষমতা এবং শিল্প উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। রেমিট্যান্সের সঙ্গে মিলিয়ে রপ্তানি দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে, ধারাবাহিকভাবে রপ্তানি আয় কমে যাওয়া বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের উপর চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর মাসে রপ্তানি আয় ১৪.২৫ শতাংশ কমে ৩৯৬ কোটি ডলারে নেমে এসেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের একই মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হ্রাস। একই আর্থিক বছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) মোট রপ্তানি ২,৩৯৯ কোটি ৬৮ লাখ ডলার হয়েছে, যা পূর্ব বছরের সমমানের তুলনায় ২.১৯ শতাংশ, প্রায় ৫৪ কোটি ডলার কম।
বিক্রয় হ্রাসের সরাসরি প্রভাব রিজার্ভের ওপর পড়ে। রিজার্ভ দুর্বল হলে আমদানি সক্ষমতা সীমিত হয়, লেটার অফ ক্রেডিট (এলসি) খোলার প্রক্রিয়ায় জটিলতা দেখা দেয় এবং ডলারের দাম বাড়ে। ফলে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং ব্যবসার খরচ বৃদ্ধি পায়। দেশের খাদ্যশস্য, জ্বালানি ও শিল্পের কাঁচামাল মূলত আমদানির ওপর নির্ভরশীল; রিজার্ভের অস্থিতিশীলতা এই সেক্টরগুলোর জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।
এই পরিস্থিতি ২০২৩ সালের শেষ ভাগ থেকে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের অভিজ্ঞতা। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি রিজার্ভের প্রধান দুই উৎস, তাই যেকোনো একটিতে বড় ধাক্কা পুরো অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। বর্তমানে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পর্যাপ্ত ডলার প্রবাহ এবং রিজার্ভের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল উল্লেখ করেছেন, ইউরোপে চলমান অর্থনৈতিক মন্দা, যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে চাহিদা হ্রাস এবং ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া পাঁচ মাস ধরে বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধিকে নেতিবাচক পথে ঠেলে দিয়েছে। তিনি যোগ করেন, বৈশ্বিক বাজারের এই পরিবর্তনগুলো দেশের রপ্তানি কাঠামোর উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, রপ্তানি আয়ের ধারাবাহিক হ্রাস রিজার্ভের ঘাটতি বাড়িয়ে তুলতে পারে, যা আমদানি সক্ষমতা ও শিল্প উৎপাদনের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। রিজার্ভের ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে মুদ্রা বাজারে অস্থিরতা বাড়াতে পারে এবং ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে পারে। ফলে, রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের প্রবাহ স্থিতিশীল না হলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ধীরগতি পাবে।
সরকারের বর্তমান নীতি রপ্তানি বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়ানোর দিকে কেন্দ্রীভূত, তবে আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা এবং গ্লোবাল চাহিদার পরিবর্তন এই লক্ষ্য অর্জনে বাধা সৃষ্টি করছে। রপ্তানি খাতের পুনরুজ্জীবনের জন্য নতুন বাজার অনুসন্ধান, পণ্যের গুণগত মান উন্নয়ন এবং মূল্য প্রতিযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন।
সংক্ষেপে, রপ্তানি আয়ের হ্রাস দেশের রিজার্ভ, আমদানি সক্ষমতা এবং শিল্প উৎপাদনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। রেমিট্যান্স ও রপ্তানির সমন্বিত প্রবাহ না থাকলে অর্থনীতির সামগ্রিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়বে। সরকারকে রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য কৌশলগত পদক্ষেপ নিতে হবে, পাশাপাশি রিজার্ভ শক্তিশালী করার জন্য রেমিট্যান্সের উৎস বিস্তৃত করতে হবে। ভবিষ্যতে রপ্তানি প্রবণতা পুনরুদ্ধার না হলে, মুদ্রা বাজারে অস্থিরতা এবং ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়তে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে দাঁড়াবে।



