যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহে ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে একটি নোটিশ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, ইরানের সঙ্গে কোনো ধরনের বাণিজ্য করা দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সব ধরনের বাণিজ্যে ২৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। এই নির্দেশনা চূড়ান্ত ও কার্যকর বলে তিনি উল্লেখ করেন, তবে শুল্কের আওতায় কোন পণ্য বা কোন দেশের কোন পণ্য সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হবে তা সম্পর্কে কোনো অতিরিক্ত তথ্য প্রদান করা হয়নি।
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের পটভূমিতে ইরানে চলমান তৃতীয় সপ্তাহের বিক্ষোভের দৃশ্য রয়েছে। গত বছরের শেষ দিকে ইরানের মুদ্রা রিয়ালের তীব্র অবমূল্যায়নের ফলে জনগণ রাস্তায় নেমে আসে, যা পরে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বৈধতা নিয়ে বৃহৎ রাজনৈতিক সংকটে রূপ নেয়। বিক্ষোভের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে প্রায় ৫০০ জন প্রতিবাদকারী এবং ৪৮ জন নিরাপত্তা কর্মী প্রাণ হারায় বলে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (HRANA) জানায়। তবে অন্যান্য আন্তর্জাতিক সূত্রের মতে, মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে এবং হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ইন্টারনেট সংযোগের সম্পূর্ণ বন্ধের ফলে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই কঠিন হয়ে পড়েছে; বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, যার মধ্যে বিবিসি অন্তর্ভুক্ত, এখন ইরানের অভ্যন্তর থেকে সরাসরি সংবাদ সংগ্রহ করতে পারছে না। এই পরিস্থিতি ট্রাম্পের শুল্ক নীতির বাস্তব প্রভাব মূল্যায়নকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ট্রাম্পের শুল্ক নীতিতে ইরানের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে চীনকে উল্লেখ করা হয়েছে, এরপর ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক এবং ভারতকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তবে তিনি ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে তা স্পষ্ট করেননি, ফলে এই দেশগুলো কীভাবে শুল্কের আওতায় পড়বে তা অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
প্রেসিডেন্টের পূর্ববর্তী মন্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন যে, ইরানি কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার জন্য যোগাযোগ করেছেন, তবে তিনি সতর্ক করে বলেন যে, কোনো বৈঠকের আগে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হতে পারে। এই বক্তব্য ইরানের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চলমান আলোচনার প্রেক্ষাপটে উঠে এসেছে। ইরানের পারমাণবিক প্রোগ্রামকে ঘিরে আরব ও পশ্চিমা দেশগুলোর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ইতিমধ্যে দেশের অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে; তদুপরি, সরকারি অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতিও অর্থনৈতিক সংকটকে তীব্র করেছে।
ডিসেম্বরের শেষের দিকে তেহরানে রিয়াল ও ডলারের মুদ্রা বিনিময় হার আরও খারাপ হয়ে যাওয়ায় দোকানদাররা রাস্তায় নেমে আসে, যা মুদ্রার রেকর্ড নিম্ন স্তরে নেমে যাওয়ার সঙ্গে যুক্ত। একই সময়ে মুদ্রাস্ফীতি ৪০ শতাংশের উপরে পৌঁছায়, ফলে রান্নার তেল, মাংস ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দ্রুত বাড়ে। এই আর্থিক চাপের মধ্যে ট্রাম্পের শুল্ক নীতি ইরানের অর্থনৈতিক সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে, বিশেষ করে চীন ও অন্যান্য প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর প্রভাব পড়বে।
ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভের তীব্রতা, অর্থনৈতিক মন্দা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের এই শুল্ক পদক্ষেপকে একটি রাজনৈতিক চাপে হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবু, শুল্কের সুনির্দিষ্ট প্রয়োগের পদ্ধতি ও প্রভাব সম্পর্কে স্পষ্টতা না থাকায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সম্প্রদায়ের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। ভবিষ্যতে এই নীতি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং ইরানের সঙ্গে যুক্ত দেশগুলো কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে দাঁড়াবে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই শুল্ক নীতি একসঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও মানবাধিকার সংক্রান্ত প্রশ্ন উত্থাপন করে। শুল্কের প্রয়োগের পরিসর ও সময়সীমা স্পষ্ট না হওয়ায়, ইরান ও তার বাণিজ্যিক অংশীদারদের জন্য নীতি পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে, ইরানের সরকারবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতা এবং মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্টের ভিত্তিতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি সংবেদনশীল বিষয় রয়ে গেছে।
এই পরিস্থিতিতে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতি এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা পরস্পরের সঙ্গে জটিলভাবে যুক্ত, যা ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক গতিপথে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।



