ঢাকায় ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত সংসদীয় নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বহু বছর ধরে নির্বাচনী প্রক্রিয়া সত্যিকারের গণতান্ত্রিক পছন্দের মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারেনি; বিরোধী দলের অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতা, ভোট গড়া নিয়ে অভিযোগ এবং আনুষ্ঠানিক ভোটের রীতি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে authoritarian প্রবণতা বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে তরুণ প্রজন্মের অনেকেই ভোটের অধিকার ব্যবহার করতে পারেনি, যা রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, জনসাধারণের জবাবদিহিতা হ্রাস এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ক্ষয় ঘটিয়েছে। এই পটভূমিতে নির্বাচনের ফলাফল গণতান্ত্রিক বৈধতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জনবিশ্বাস পুনর্গঠন এবং নাগরিক-রাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন দিক নির্ধারণের ঐতিহাসিক সুযোগ প্রদান করে।
তবে ভোটের স্বচ্ছতা পুনরুদ্ধার একা যথেষ্ট নয়। আসন্ন সরকারকে এমন একটি অর্থনীতির মুখোমুখি হতে হবে যা দীর্ঘ সময়ের নীতি অবহেলা, প্রতিষ্ঠানগত অবক্ষয় এবং দুর্বল মুদ্রা নীতি পরিচালনার ফলে গভীর সংকটে রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গতি ধীর হয়ে গেছে; জিডিপি বৃদ্ধির হার হ্রাস পেয়েছে, মুদ্রাস্ফীতি উচ্চ স্তরে আটকে আছে এবং ব্যাংকিং খাত বাড়তে থাকা নন-পারফরমিং লোনের বোঝায় সংগ্রাম করছে। বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ কমে গেছে, সরকারি বিনিয়োগের দক্ষতা হ্রাস পেয়েছে, পাবলিক ঋণ বাড়ছে, বাস্তব মজুরি হ্রাস পাচ্ছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি ধীর। এসব উপাদান একত্রে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় দীর্ঘমেয়াদী চাপ সৃষ্টি করছে।
এই চ্যালেঞ্জের মুখে নতুন সরকারকে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, শাসনব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং সাধারণ মানুষের জন্য উন্নত ফলাফল নিশ্চিত করার জন্য কঠোর সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। যদিও সংস্কার তালিকা দীর্ঘ ও জটিল, তবু তিনটি জরুরি ও পারস্পরিক সংযুক্ত বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন। এই তিনটি বিষয়ই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে নির্ধারণের পাশাপাশি নতুন প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করবে।
প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে নতুন সরকারের শীর্ষ অর্থনৈতিক লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস করে, বাস্তব মজুরিতে চাপ বাড়ায় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই মূল্য স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে নীতি সমন্বয়, সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিকরণ এবং বাজার পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করা জরুরি।
দ্বিতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে ব্যাংকিং খাতের সুস্থতা ও নন-পারফরমিং লোনের হ্রাসকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। ঋণ ডিফল্টের বৃদ্ধি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে ফেলেছে, যা ক্রেডিট প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে এবং বিনিয়োগের পরিবেশকে দুর্বল করে। তাই ঋণ পুনর্গঠন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও তহবিলের স্বচ্ছতা বাড়ানোর জন্য কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
তৃতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগের আকর্ষণ বাড়ানো, পাবলিক বিনিয়োগের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা উন্নত করা অন্তর্ভুক্ত। বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে নিয়ন্ত্রক কাঠামো সরলীকরণ, কর নীতি পুনর্বিবেচনা এবং অবকাঠামো প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে, ঋণ সেবা ও পুনঃনির্ধারণের মাধ্যমে পাবলিক ঋণের বোঝা কমিয়ে আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যাবে।
এই তিনটি মূল দিকের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি ত্বরান্বিত করা, বাস্তব মজুরি বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা নেটওয়ার্ক শক্তিকরণও নতুন সরকারের দায়িত্বের অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে। অর্থনৈতিক নীতি সমন্বয় ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক প্রতিযোগিতামূলকতা বাড়ানো এবং জনসাধারণের জীবনের মান উন্নত করা লক্ষ্য।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, নির্বাচনের ফলাফল এবং নতুন সরকারের অর্থনৈতিক পদক্ষেপগুলো দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা মূল্যায়নের মূল সূচক হয়ে দাঁড়াবে। যদি নতুন সরকার এই অগ্রাধিকারগুলো সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে তা কেবল অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারই নয়, জনগণের সরকারের প্রতি আস্থা পুনর্গঠনেও সহায়তা করবে। অন্যদিকে, অগ্রাধিকারগুলোতে দেরি বা অকার্যকর পদক্ষেপের ফলে অর্থনৈতিক অবনতি অব্যাহত থাকতে পারে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে পারে।
সুতরাং, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পরপরই নতুন সরকারকে অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে দৃঢ় সংকল্প ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে, যাতে দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বাস্থ্যের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা তৈরি হয়।



