ইন্টারিম সরকার সম্প্রতি অষ্টটি সংস্কার‑সংক্রান্ত আদেশ জারি করেছে; এ আদেশগুলোর স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে স্বচ্ছতা আন্তর্জাতিক বাংলাদেশ (টিআইবি) তীব্র সমালোচনা জানিয়েছে। টিআইবি গতকাল তার পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করে উল্লেখ করেছে যে, অ্যান্টি‑করাপশন কমিশন (সংশোধন) আদেশ, পুলিশ কমিশন আদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আদেশ, পাবলিক অডিট আদেশ, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব প্রশাসন আদেশ, সাইবার সিকিউরিটি আদেশ, পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন আদেশ এবং ন্যাশনাল ডেটা ম্যানেজমেন্ট আদেশ একসঙ্গে জারি করা হয়েছে।
টিআইবি উল্লেখ করেছে যে, অধিকাংশ আদেশ একতরফা খসড়া করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে খসড়া আদেশ সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়, যা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার চেয়ে দায়িত্ব এড়ানোর উদ্দেশ্য বলে তারা ব্যাখ্যা করেছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান ঢাকা অফিসে ‘ইন্টারিম সরকারের সংস্কার নকশায় অনিচ্ছা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সংস্কার‑সংক্রান্ত বেশিরভাগ উদ্যোগ বাস্তবায়নের সময় মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “সরকারের স্বচ্ছতা ও সক্রিয় প্রকাশের মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতা দেখা গেছে, যা জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ আইন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলেছে।”
ইফতেখারুজ্জামান আরও যোগ করেন, “এই ধরনের আত্মসমর্পণ কেন ঘটেছে এবং এর পেছনে প্রকৃত দুর্বলতা কোথায়, তা স্পষ্ট নয়; কারণ আমরা সরকারী অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার অংশ নই।” তিনি উল্লেখিত প্রশ্নের কোনো চূড়ান্ত উত্তর না থাকলেও, টিআইবির পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে সংস্কার‑নির্বাচনের জন্য কোনো স্পষ্ট কৌশলগত দিকনির্দেশনা নেই।
টিআইবি উল্লেখ করেছে যে, শিক্ষা, কৃষি ও বেসরকারি ব্যবসা সহ বহু জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরকে সংস্কার পরিকল্পনা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের বাদ পড়া সেক্টরগুলোতে সংস্কার‑সংক্রান্ত নীতি না থাকলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে প্রভাব পড়তে পারে। তদুপরি, কোনো কার্যকরী পরিকল্পনা ছাড়া সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের জন্য জনমতভিত্তিক ভোটের ব্যবস্থা করা হয়নি।
সংস্থার পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়েছে, সংস্কার‑প্রতিরোধী শক্তিগুলোকে চিহ্নিত ও মোকাবেলা করার গুরুত্ব যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। ফলে, এই শক্তিগুলোর প্রতি আত্মসমর্পণ করা সংস্কার প্রক্রিয়াকে দুর্বল করেছে এবং বহু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করেছে।
টিআইবির বিশ্লেষণ অনুসারে, ইন্টারিম সরকারের সংস্কার‑প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ ও পরিকল্পনা সংক্রান্ত মৌলিক নীতি অবহেলিত হয়েছে। যদিও সরকার থেকে কোনো সরাসরি মন্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে এই পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতে রাজনৈতিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, টিআইবির এই সমালোচনা সরকারকে সংস্কার‑নির্ধারণে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্বচ্ছ পদ্ধতি গ্রহণে বাধ্য করতে পারে। অন্যদিকে, সংস্কার‑প্রতিরোধী গোষ্ঠীর প্রভাব যদি অব্যাহত থাকে, তবে ইন্টারিম সরকারের সংস্কার‑অভিযান দীর্ঘমেয়াদে ব্যর্থতার মুখে পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে, পরবর্তী ধাপ হিসেবে সরকারকে টিআইবির সুপারিশগুলো বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট সেক্টরগুলোর সঙ্গে পরামর্শমূলক প্রক্রিয়া চালু করা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আদেশের পূর্ণ টেক্সট প্রকাশ করা প্রয়োজন হতে পারে। এ ধরনের পদক্ষেপ না নিলে, সংস্কার‑প্রক্রিয়ার বৈধতা ও কার্যকারিতা নিয়ে জনমত ও রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে পারে।



