ডা. শফিকুর রহমান, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের আমির, সোমবার রাত ১২ জানুয়ারি ঢাকা চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক আলোচনা সভায় পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিম ভাগের সম্পর্ক ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, ২৩ বছর ধরে একসঙ্গে চলা পাকিস্তান দুই ভাগের মধ্যে ন্যায্য আচরণ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ ছিল, বিশেষ করে পশ্চিম পাকিস্তান পূর্বের জনগণের প্রতি ন্যায়বিচার প্রদান করেনি।
এই ন্যায়বিচারের অভাবের ফলে সত্তরের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের আগে একটি নীরব বিরোধ গড়ে ওঠে, যা পরে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মোড় নেয়। শফিকুর রহমান বলেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনই সেই বিরোধের প্রকাশ, এবং এই নির্বাচনের ফলাফল ও পরবর্তী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় সামরিক বাহিনীর ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের গরম মাসে সেনাবাহিনীর সঠিক পদক্ষেপগুলো না থাকলে দেশটি সম্পূর্ণ গৃহযুদ্ধের মুখে পড়ত। বিশেষ করে ৩, ৪ ও ৫ আগস্টের দিনগুলোতে সেনাবাহিনীর কার্যক্রম দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা না থাকলে আজকের বাংলাদেশে তিনি নিজের কথা বলতে পারতেন না।
শফিকুর রহমান জোর দিয়ে বলেন, স্বাধীনতার সংগ্রামে কোনো একক ব্যক্তি বা দলকে মাস্টারমাইন্ড হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না; পুরো জনগণই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের চালিকাশক্তি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, জামায়াত বা অন্য কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী স্বাধীনতার জন্য তাদের কোনো স্বতন্ত্র ক্রেডিট দাবি করে না; এই বিপ্লবের স্রষ্টা হলেন সমগ্র বাংলাদেশি জনগণ।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে তিনি স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, ভোটারদের ভয়ভীতি ছাড়াই তাদের ইচ্ছামতো ভোট দিতে সক্ষম হতে হবে, এবং এ জন্য নির্বাচন কমিশনকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে কোনো ধরনের চাপ বা হুমকি না থাকে।
পূর্বের “বোঝাপড়া” ভিত্তিক নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি তিনি প্রত্যাখ্যান করেন, এবং বলেন, ভবিষ্যতে এমন কোনো নির্বাচন গ্রহণযোগ্য নয় যেখানে ফলাফল পূর্বনির্ধারিত হয়। তিনি নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য সকল রাজনৈতিক দলের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন।
ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি ১৯০ বছরের শোষণমূলক দাসত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেন, যেখানে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকরা পূর্বের জনগণের সঙ্গে কখনোই ন্যায়সঙ্গত আচরণ করেনি। এই দীর্ঘকালীন অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনগণের নীরব প্রতিরোধই স্বাধীনতার প্রথম ধাপ হয়ে ওঠে।
শফিকুর রহমানের মতে, সত্তরের নির্বাচন ও মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতা শেষ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশ গঠন করে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই দুইটি ঐতিহাসিক ঘটনা একসাথে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকে রূপান্তরিত করেছে, যা আজকের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছে।
আলোচনার শেষে তিনি রাজনৈতিক নেতাদের আহ্বান জানান, ইতিহাসের শিক্ষা মেনে চলতে এবং ভবিষ্যতে ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও পারস্পরিক আস্থা নিশ্চিত করতে একসাথে কাজ করতে। তিনি উল্লেখ করেন, স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যে ত্যাগ ও ক্ষতি স্বীকার করা হয়েছে, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ন্যায়সঙ্গত শাসন নিশ্চিত করার দায়িত্বকে আরও দৃঢ় করে।
শফিকুর রহমানের বক্তব্যের মূল সুর হল, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানের রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, ন্যায়সঙ্গত ও জনগণমুখী করে তোলা, যাতে স্বাধীন বাংলাদেশের সাফল্যকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যায়।



