ইরানে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতা তুরস্কের সীমান্তে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে, বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন। তুরস্কের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী প্রায় ৮ কোটি কুর্দি জনগোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা কেবল অভিবাসন ও মাদক পাচারের মতো প্রচলিত সমস্যার বাইরে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। ইরানের অভ্যন্তরে শাসনতান্ত্রিক শূন্যতা বা বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে, কুর্দিস্তান ফ্রি লাইফ পার্টি (PJAK) সহ সশস্ত্র গোষ্ঠী এই ফাঁকটি ব্যবহার করে তাদের প্রভাব বিস্তার করতে পারে, যা তুরস্কের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, তুরস্কের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত কুর্দি জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং তাদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তুর্কি কর্তৃপক্ষের মতে, ইরানের সরকার কখনও কখনও ইরাক-ইরান সীমান্তে সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রম সম্পর্কে স্পষ্টভাবে মন্তব্য করে না, ফলে তুরস্ককে অপ্রত্যাশিত নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলে।
তুরস্ক বর্তমানে সিরিয়ার ইস্যুতে জটিল পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে, যেখানে ইরানের ভূমিকা এবং তার অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা অতিরিক্ত চাপের কারণ। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনকে এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার মূল পথ হিসেবে দেখছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ইরানকে তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে প্রকৃত সহযোগিতা এবং পুনর্মিলনের পথে অগ্রসর হতে হবে।
ফিদান তুরস্কের দৃষ্টিকোণ থেকে ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি সমাধানে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের ভূমিকা উল্লেখ করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, এর্দোয়ান ইরানকে বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিক রাজনীতির মূলধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য কার্যকর মধ্যস্থতাকারী হতে পারেন। তুরস্কের জন্য ইরানের পুনরায় স্থিতিশীলতা কেবল সীমান্ত নিরাপত্তা নয়, বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক সমন্বয় এবং অর্থনৈতিক সংযোগের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
কুর্দি জনগোষ্ঠীর মধ্যে নতুন উত্তেজনা উদ্ভবের সম্ভাবনা তুরস্কের নিরাপত্তা নীতিতে পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে তুলেছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, যদি ইরানের অভ্যন্তরে শাসন কাঠামো দুর্বল হয়, তবে PJAK এবং অনুরূপ গোষ্ঠী সীমান্ত পারাপার করে তুর্কি ভূখণ্ডে কার্যক্রম বাড়াতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি তুরস্কের সশস্ত্র বাহিনীর প্রস্তুতি এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত সম্পদ ব্যয় করার প্রয়োজন তৈরি করবে।
অন্যদিকে, তুরস্কের পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে ইরানের সঙ্গে নতুন কূটনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বানও তীব্র হয়েছে। ফিদান উল্লেখ করেছেন, ইরানের সঙ্গে পুনরায় সংলাপ এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সহযোগিতা গড়ে তোলা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। তুরস্কের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা যদি সফল হয়, তবে ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা তুরস্কের সীমান্তে সরাসরি হুমকি রূপে রূপান্তরিত হওয়া রোধ করা সম্ভব হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা তুরস্কের সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, যা কুর্দি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক গতিবিধি, সশস্ত্র গোষ্ঠীর সম্ভাব্য কার্যক্রম এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক সম্পর্কের জটিলতা দ্বারা প্রভাবিত। তুরস্কের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা নীতি এই পরিবর্তনশীল পরিবেশে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে, যাতে অপ্রত্যাশিত নিরাপত্তা ঝুঁকি কমিয়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যায়।



