গাজা উপত্যকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীতে (International Stabilization Force – ISF) বাংলাদেশের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা কয়েকটি শর্তের ওপর নির্ভরশীল, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ গাজার ওপর ইসরায়েলি হামলার নিন্দা করে এবং অবিলম্বে আগুন নিভে যাওয়ার ও ইসরায়েলি সেনা সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে আসছে।
ইউএন নিরাপত্তা পরিষদ ১৭ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে গাজার স্থিতিশীলতার জন্য একটি আন্তর্জাতিক বাহিনীর গঠন প্রস্তাব গ্রহণ করে, যেখানে ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (ISF) গঠনের কথা উল্লেখ করা হয়। এই প্রস্তাবে নিরাপত্তা পরিষদের অধিকাংশ মুসলিম দেশই সমর্থন জানায় এবং আরব ও মুসলিম দেশগুলো যৌথভাবে সুপারিশ করে যাতে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। শফিকুল আলমের মতে, বাংলাদেশ এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব স্বীকার করে এবং অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর আগ্রহ সম্পর্কে জানে, তবে অংশগ্রহণের আগে সতর্ক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ISF-এ যোগদানের ইচ্ছা নির্দিষ্ট শর্তের পূরণে নির্ভরশীল। প্রথমত, বাহিনীর কার্যকাল অস্থায়ী হতে হবে এবং তা সরাসরি ইউএন নিরাপত্তা পরিষদের ম্যান্ডেটের অধীনে পরিচালিত হবে। দ্বিতীয়ত, গাজায় একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা আবশ্যক, যাতে সশস্ত্র সংঘাতের পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায়। তৃতীয় শর্ত হিসেবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব ফিলিস্তিনিদের হাতে হস্তান্তর করা অন্তর্ভুক্ত। এই শর্তগুলো পূরণ হলে বাংলাদেশ ISF-এ অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুত হবে বলে শফিকুল আলম জানান।
গাজা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট। ১৯৬৭ সালের সীমানার ভিত্তিতে আল-কুদস আল-শরিফকে রাজধানী করে একটি সার্বভৌম ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেশটি ধারাবাহিকভাবে সমর্থন করেছে। এছাড়া, ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে রক্ষা করা এবং ইসরায়েলি আক্রমণ বন্ধের আহ্বান বাংলাদেশ তার কূটনৈতিক নীতির মূল অংশ হিসেবে তুলে ধরে। এই নীতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করে এবং গাজার স্থিতিশীলতার জন্য বহুপাক্ষিক সমর্থন গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
শফিকুল আলমের সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র সফরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের আন্ডার সেক্রেটারি অ্যালিসন হুকার সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে গাজায় প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক বাহিনীর অংশগ্রহণে বাংলাদেশের নীতিগত আগ্রহ প্রকাশ করা হয়। যদিও নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই আলোচনাকে কূটনৈতিক সমন্বয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, যদি ISF সত্যিই অস্থায়ী এবং ইউএন ম্যান্ডেটের অধীনে কাজ করে, তবে বাংলাদেশ তার শান্তি রক্ষাকারী ভূমিকা ও মুসলিম বিশ্বের সমর্থনকে একত্রিত করে গাজার নিরাপত্তা কাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
আঞ্চলিক দৃষ্টিকোণ থেকে ISF গঠনের ফলে গাজার নিরাপত্তা পরিবেশে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। একদিকে, আন্তর্জাতিক সেনাবাহিনীর উপস্থিতি গাজার নাগরিকদের সুরক্ষা বাড়াবে এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ সুগম করবে। অন্যদিকে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রত্যাহার এবং ফিলিস্তিনিদের হাতে প্রশাসনিক দায়িত্ব হস্তান্তর গাজার রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনকে শক্তিশালী করবে। তবে এই প্রক্রিয়ার সাফল্য নির্ভর করবে শর্তগুলো কত দ্রুত এবং কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় তার ওপর।
পরবর্তী মাইলস্টোন হিসেবে ইউএন নিরাপত্তা পরিষদের ISF প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত অনুমোদন এবং শর্তাবলীর স্পষ্টীকরণ গুরুত্বপূর্ণ। যদি শর্তগুলো পূরণ হয়, বাংলাদেশ তার সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমন্বয় করে গাজার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে কাজ করবে। এই ধাপগুলো গাজার দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও নিরাপত্তার ভিত্তি গড়ে তুলতে সহায়তা করবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক গতিবিধিতে নতুন দিক উন্মোচন করবে।



