ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ইভার্স ইজাবসের নেতৃত্বে তিনজনের একটি দল ১২ জানুয়ারি দুপুরে ঢাকা শহরে জামায়াতের আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল জামায়াতের সরকার গঠনের সম্ভাবনা, সকল রাজনৈতিক দলের সমান সুযোগের নিশ্চয়তা এবং সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ বা অভিযোগ সম্পর্কে স্পষ্টতা পাওয়া। একই সঙ্গে ইইউ প্রতিনিধিদল জিজ্ঞাসা করেন, যদি জামায়াত সরকার গঠন করে, তবে প্রতিবেশী দেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হবে।
ইইউ দলের সদস্যরা জোর দিয়ে বলেছিলেন, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কোনো পক্ষপাত না রেখে সব দলকে সমান সুযোগ দিতে হবে এবং যে কোনো অভিযোগ বা চ্যালেঞ্জ দ্রুত সমাধান করা জরুরি। তারা বিশেষভাবে জানতে চেয়েছিলেন, জামায়াতের কাছে কি নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ আছে এবং সেগুলো কীভাবে সমাধান করা হবে। এছাড়া, জামায়াতের সরকার গঠনের পর প্রতিবেশী দেশ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কূটনৈতিক নীতি কী হবে, তা জানার ইচ্ছা প্রকাশ করা হয়।
বৈঠকের পরে জামায়াতের আমির স্পষ্ট করে জানান, দলটির কিছু অভিযোগ রয়েছে তবে সেগুলো এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তিনি উল্লেখ করেন, এই অভিযোগগুলো নির্বাচন কমিশন এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে জানানো হবে, এবং যদি তাৎক্ষণিক সমাধান না হয় তবে জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে দলটি স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং নির্বাচনের সুষ্ঠুতা নিশ্চিত করতে চায়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রশ্নে জামায়াতের আমির জানান, দলটি বিশ্বব্যাপী সব সভ্য, শান্তিপ্রিয় এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে ইচ্ছুক। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো নির্দিষ্ট দেশের প্রতি ঝোঁক না রেখে সমতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে কূটনৈতিক নীতি গড়ে তোলা হবে। এভাবে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে এগিয়ে নেওয়া যাবে, এটাই দলটির লক্ষ্য।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে জামায়াতের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট। তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে। কোনো এক দেশের প্রতি অতি-নির্ভরতা না রেখে, সব প্রতিবেশীর সঙ্গে সমান আচরণ করা হবে, এটাই জামায়াতের নীতি।
দলটি নারী নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছে। জামায়াতের আমির উল্লেখ করেন, নারীরা এই নির্বাচনে জামায়াতকে সমর্থন করবে এবং ইতিমধ্যে তা স্পষ্ট হয়ে আসছে। তবে তিনি জানান, নির্বাচনী প্রচারকালে নারীদের ওপর হিজাব খুলে নেওয়া, তাড়িয়ে দেওয়া এবং বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার বিরুদ্ধে দলটি কঠোর পদক্ষেপ নেবে এবং সকল স্তরে নারীর মর্যাদা রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে।
রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের দায়িত্ব হল সব শ্রেণি, পেশা, বয়স এবং লিঙ্গের মানুষকে সমানভাবে সম্মান করা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলই একক গোষ্ঠীর স্বার্থে কাজ করা উচিত নয়; বরং সমগ্র সমাজের মঙ্গলের জন্য কাজ করা দরকার। এই নীতি অনুসরণ করে দলটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে অবদান রাখতে চায়।
বৈঠকের পর ইইউ প্রতিনিধিদল জামায়াতের উক্তিগুলো নথিভুক্ত করে, পরবর্তী পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের জন্য ব্যবহার করবে। তারা উল্লেখ করেছে, জামায়াতের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নীতি নিয়ে আরও আলোচনা চালিয়ে যাবে।
এই সাক্ষাৎকারের ফলস্বরূপ, জামায়াতের সরকার গঠনের সম্ভাবনা এবং তার কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনার পরিধি বাড়বে বলে আশা করা যায়। বিশেষ করে নারী নিরাপত্তা ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়গুলোতে দলটির অবস্থান ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
পরবর্তী ধাপে জামায়াতের অভিযোগগুলো নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকারকে জানিয়ে সমাধানের পথ খোঁজা হবে, এবং যদি তা ব্যর্থ হয় তবে জনসাধারণের সামনে বিষয়টি উন্মোচিত করা হবে। একই সঙ্গে ইইউ প্রতিনিধিদল দেশের রাজনৈতিক পরিবেশের পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাবে, যাতে সকল দল সমান সুযোগ পায় এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া ন্যায়সঙ্গত থাকে।



