ইরানের রাজধানী তেহরান ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা দুই রাত ধরে সরকারবিরোধী প্রতিবাদ ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। তেহরানের একটি মসজিদে অগ্নিকাণ্ড ঘটার পাশাপাশি বিক্ষোভকারীরা ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পূর্বের রাজতান্ত্রিক পতাকা উড়িয়ে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।
তেহরানের সাদা‑আবাত এলাকায় বসবাসকারী ৬০ বছর বয়সী এক নারী জানান, তিনি ধারাবাহিক দুই রাত ধরে রাস্তায় ছিলেন এবং নিজের চোখে মসজিদে আগুন লাগতে দেখেছেন। তিনি বলেন, গত বৃহস্পতিবারের পর শুক্রবার রাতেও মাসহাদ, তাবরিজ, উরুমিয়া, ইসফাহান, কারাজ ও ইয়েজদের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরে একই রকম অশান্তি দেখা গিয়েছে।
অভিভাবকদের সতর্ক করা হয়েছে যেন তারা সন্তানদের রাস্তায় না পাঠায়। একই সঙ্গে, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে কোনো প্রাণহানি ঘটলে সরকারকে দায়ী না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা সত্ত্বেও, হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় উপস্থিত হয়েছে।
তেহরানের একজন প্রকৌশলী, আমির রেজা, বর্ণনা করেন যে নিরাপত্তা বাহিনী গুলিবিদ্ধ ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে প্রতিবাদ দমন করছে। তিনি উল্লেখ করেন, এক পর্যায়ে সিভিল পোশাক পরা মিলিশিয়া ও পুলিশ সদস্যরা সরাসরি গুলি চালাতে শুরু করলে সাধারণ মানুষ আতঙ্কে ভেসে যায়।
প্রতিবাদের সূচনা ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে ব্যবসায়ীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন থেকে হয়েছে, তবে দ্রুতই তা সহিংস রূপ ধারণ করে। একটি আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গত বৃহস্পতিবারই তেহরানে দুইশতাধিক বিক্ষোভকারী গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছে। ত্রয়োদশ দিন ধরে চলা এই আন্দোলনে প্রাণহানির সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।
ইরান সরকার এই সহিংসতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি দায়ী করে এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে অভিযোগ জানিয়েছে। তেহরানের কর্মকর্তারা দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের উস্কানিতে একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ রক্তাক্ত রূপ নিয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর নতুন হুমকি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, যদি ইরান সরকার সাধারণ নাগরিকের মৃত্যুর ধারাবাহিকতা থামাতে না পারে, তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে বড় আকারের সামরিক আক্রমণ চালাবে। ট্রাম্পের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান সরকার দু’ধরনের চরম বিপদের মুখে—একদিকে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক চাপ।
এই ঘটনাগুলি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দৃশ্যপটে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া ভবিষ্যতে সরকার-বিপ্লবের ভারসাম্যকে প্রভাবিত করবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। তেহরানের শাসন কাঠামো যদি জনমতকে দমন করতে ব্যর্থ হয়, তবে আরও বড় প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্ক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নীতিতে নতুন মোড় আনতে পারে।
প্রতিবাদে নিহত ও আহতদের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহৃত অতিরিক্ত বলের পর্যালোচনা দাবি করছে। তেহরানের সরকার যদি আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সংযমের পথে না যায়, তবে দেশের অভ্যন্তরে আরও বিশাল রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে।
অবশেষে, ইরানের বর্তমান অশান্তি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় স্তরে গভীর প্রভাব ফেলবে। সরকার কীভাবে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সংস্কারের সমন্বয় করবে, তা নির্ধারণ করবে দেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা ও জনগণের নিরাপত্তা।



