সকাল ১০টায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সামনে তদন্ত কমিশন তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছে। কমিশন ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন এবং গোয়েন্দা সংস্থার কিছু অংশের অংশগ্রহণের অভিযোগের ওপর কাজ করেছিল।
কমিশনের সদস্যরা জানায়, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত এই তিনটি নির্বাচনে নির্বাচনী অনিয়মের মাত্রা বিশাল, যেখানে কয়েক হাজার সরকারি কর্মী জড়িত ছিল। তবে তদন্তের জন্য বরাদ্দ করা সময় সীমিত ও তথ্য সংগ্রহের জটিলতা বিবেচনা করে, ব্যক্তিগত নাম ও নির্দিষ্ট ভূমিকা চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।
কমিশনের সভাপতি, হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন, উপস্থাপনায় উল্লেখ করেন যে ২০০৮ সালের নির্বাচনেও অনিয়মের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে এবং তা পুনরায় তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা না হলে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
কমিশনের অন্যান্য সদস্য, সাবেক গ্রেড‑১ কর্মকর্তা শামীম আল মামুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক, আইনজীবী তাজরিয়ান আকরাম হোসাইন এবং নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মো. আবদুল আলীমও একই রকম উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা যুক্তি দেন, নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করার জন্য ভোটারদের অধিকার সীমাবদ্ধ করা, সংবিধানের মৌলিক নীতি লঙ্ঘনের সমতুল্য।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমও উপস্থিত থেকে কমিশনের কাজের গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং সরকারকে প্রাপ্ত সুপারিশ অনুসরণ করে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন, কমিশনের কাজের জন্য জুন মাসে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ একটি নোট জারি করে গঠন অনুমোদন দিয়েছিল এবং প্রাথমিকভাবে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে বাস্তবিক দেরি ও অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজনের কারণে সময়সীমা বৃদ্ধি করা হয়।
তিনটি নির্বাচনের ওপর দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা গড়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও মানবাধিকার সংস্থা দাবি করে যে, ভোটারদের স্বেচ্ছা ভোটদান নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়া হলে, ফলাফলকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে ম্যানিপুলেট করা সম্ভব। এই অভিযোগের ভিত্তিতে, কমিশন নির্বাচনের ফলাফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য পদক্ষেপের সুপারিশ করে।
কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত কৌশলগুলোতে ভোটার তালিকা পরিবর্তন, ভোটার কার্ডের অনিয়মিত ব্যবহার এবং ভোট গণনার পদ্ধতিতে হস্তক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়া, নির্বাচনী কর্মীদের মধ্যে কিছু অংশের অবৈধ নির্দেশনা ও চাপের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে, কমিশনের সুপারিশ অনুসরণ না করা হলে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে পারে। বিশেষ করে, বিরোধী দলগুলো এই প্রতিবেদনকে রাজনৈতিক দায়িত্ব আরোপের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, আর সরকারকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রদর্শনের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর, সরকারী পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। তবে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, সরকার এই বিষয়টি নিয়ে সংসদে আলোচনার সূচনা করতে পারে অথবা স্বতন্ত্র তদন্তের জন্য অতিরিক্ত কমিটি গঠন করতে পারে।
এই তদন্তের মূল উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনের বৈধতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, যাতে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরায় বিশ্বাসযোগ্য হয়। কমিশনের কাজের ফলাফল ও পরবর্তী পদক্ষেপগুলো দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে কীভাবে প্রভাব ফেলবে, তা সময়ের সাথে স্পষ্ট হবে।



