গাম্বিয়া ২০১৯ সালে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে (আইসিজে) মামলা দায়ের করে। সোমবার, হ্যাগের আইসিজে আদালতে এই মামলার পূর্ণ শুনানি শুরু হয়েছে, যেখানে মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘনের জন্য দায়ী করা হচ্ছে। মামলাটি রোহিঙ্গা জনগণের মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ ও আইনি দায়িত্ব নির্ধারণের লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা জনগণের ওপর ব্যাপক আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণের ফলে প্রায় ৭,৩০,০০০ রোহিঙ্গা বাসস্থান ত্যাগ করে প্রতিবেশী বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে প্রবেশ করে। শরণার্থীরা গৃহহীনতা, নিঃশর্ত হত্যাকাণ্ড, ব্যাপক ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
জাতিসংঘের একটি ফ্যাক্ট‑ফাইন্ডিং মিশন ২০১৭ সালের ঘটনাগুলোকে “গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড” হিসেবে চিহ্নিত করে। মিশনের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সামরিক বাহিনীর পরিকল্পিত ও সমন্বিত আক্রমণ রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। মিয়ানমার সরকার এই রিপোর্ট ও গণহত্যার অভিযোগকে প্রত্যাখ্যান করে, তবে আন্তর্জাতিক আদালতে বিষয়টি বিচারাধীন হয়েছে।
গাম্বিয়া, পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, ২০১৯ সালে আইসিজেতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করে। গাম্বিয়ার আইনমন্ত্রী দাউদা জালো আদালতে রোহিঙ্গা জনগণের জীবনযাত্রা ধ্বংসের অভিযোগ তুলে ধরেন এবং মিয়ানমারকে “ধ্বংসের লক্ষ্যবস্তু” হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, রোহিঙ্গা জনগণ শান্তিপূর্ণ জীবন ও মর্যাদার দাবি রাখে, তবে তাদের ওপর গৃহীত নীতি তাদের স্বপ্নকে ভেঙে দিয়েছে।
এই শুনানি আইসিজের ইতিহাসে প্রথম পূর্ণ গণহত্যা মামলার সূচনা চিহ্নিত করে, যা এক দশকেরও বেশি সময়ের পর সম্পূর্ণভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে। বিচারকবৃন্দ গাম্বিয়া ও মিয়ানমার উভয়ের লিখিত ও মৌখিক যুক্তি শোনার পর পরবর্তী রায়ের জন্য প্রয়োজনীয় প্রমাণ বিশ্লেষণ করবেন। মামলাটি মিয়ানমারের সীমা অতিক্রম করে অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মামলায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই মামলাটি ব্যাপক মনোযোগ পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা আইসিজের প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের শক্তিশালী উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে, আঞ্চলিক সংস্থা ASEAN মিয়ানমারকে সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করার আহ্বান জানিয়েছে, যদিও গাম্বিয়ার মামলা আইসিজে সরাসরি তার বিচারিক ক্ষমতা ব্যবহার করে।
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে মামলাটির প্রতি উচ্চ প্রত্যাশা দেখা যায়। ৫২ বছর বয়সী এক শরণার্থী, যিনি বর্তমানে বাংলাদেশে বসবাস করছেন, আইসিজে শুনানিতে আশাবাদ প্রকাশ করে বলেন, এই রায় বিশ্বকে মিয়ানমারের গণহত্যা স্বীকার করতে বাধ্য করবে এবং শরণার্থীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, রোহিঙ্গা জনগণ দীর্ঘদিনের কষ্টের পর এখন ন্যায়ের দাবি রাখে।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, আইসিজের রায় যদি মিয়ানমারকে দায়ী করে, তবে তা দেশটির উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও ক্ষতিপূরণ আদায়ের পথ খুলে দেবে। তবে রায়ের কার্যকরীতা নির্ভর করবে মিয়ানমারের রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থনের ওপর। কিছু বিশ্লেষক পূর্বের আইসিজের রায়, যেমন সুদানের দারফুর মামলায় দেখা গিয়েছে, যে রায়ের পরেও বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে।
মিয়ানমার সরকার এখনও আইসিজের বিচারিক প্রক্রিয়াকে অস্বীকার করে এবং জাতিসংঘের ফ্যাক্ট‑ফাইন্ডিং মিশনের ফলাফলকে অগ্রাহ্য করে। তবে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মিয়ানমারকে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিণতির মুখোমুখি হতে হতে পারে। বিশেষ করে, বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা দেশের অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
আইসিজে রায়ের প্রত্যাশিত সময়সীমা ২০২৭ সালের মধ্যে হতে পারে, যদিও আদালত প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংগ্রহে অতিরিক্ত সময় নিতে পারে। রায় প্রকাশের পর, গাম্বিয়া ও রোহিঙ্গা শরণার্থীরা তাৎক্ষণিক ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা চাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে, মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড মেনে চলতে বাধ্য করার জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নতুন রেজল্যুশনের সম্ভাবনা উন্মুক্ত রয়েছে।
সারসংক্ষেপে, গাম্বিয়ার রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার আইসিজে পূর্ণ শুনানি আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে। মামলাটি মিয়ানমারের মানবাধিকার রেকর্ডের ওপর কঠোর পর্যালোচনা এনে দিতে পারে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর পুনর্গঠনকে ত্বরান্বিত করতে পারে। ভবিষ্যতে রায়ের বাস্তবায়ন ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া মিয়ানমারের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



