আন্তর্জাতিক পণ্যবাজারে স্বর্ণের দাম প্রথমবারের মতো এক আউন্সে ৪,৬০০ ডলারের সীমা অতিক্রম করে রেকর্ড ভাঙেছে, একই সঙ্গে রুপার দামও সর্বকালের শীর্ষে পৌঁছেছে। এই উত্থানটি বিশ্বব্যাপী ভূ‑রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলের বিরুদ্ধে চলমান ফৌজদারি তদন্তের প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ সম্পদে ঝুঁকির ফলে ঘটেছে।
মার্কিন সময়ে সোমবারের স্পট বাজারে স্বর্ণের দাম ১.৭ শতাংশ বাড়ে এবং প্রতি আউন্সে ৪,৫৮৪.৭৪ ডলারে স্থির হয়। দিনের শুরুর দিকে দাম অল্প সময়ের জন্য ৪,৬০০.৩৩ ডলারের রেকর্ড স্তরে পৌঁছায়, যা পূর্বের সর্বোচ্চ মানকে অতিক্রম করে। ফেব্রুয়ারি ডেলিভারির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের গোল্ড ফিউচার্সও ২.১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি আউন্সে ৪,৫৯৫.৩০ ডলারে লেনদেন হয়।
এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে মূলত জিওপলিটিক্যাল অনিশ্চয়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের সম্ভাব্য সামরিক সম্পৃক্ততার উদ্বেগ কাজ করছে। একই সঙ্গে ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যানের ওপর চালু হওয়া অপরাধমূলক তদন্ত আর্থিক নীতি ও মুদ্রা বাজারে অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলেছে, ফলে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।
কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার উল্লেখ করেন, বর্তমান ভূ‑রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ফেডারেল রিজার্ভের নেতৃত্বের ওপর তদন্তের ফলে স্বর্ণের চাহিদা বাড়ার প্রাকৃতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, এই ধরনের অনিশ্চয়তা স্বর্ণের দামকে উর্ধ্বমুখী রাখতে সহায়তা করে এবং বাজারে নিরাপত্তা সন্ধানকারী বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি আকর্ষণীয় বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়।
রুপার দিকেও একই প্রবণতা দেখা যায়। স্পট রুপার দাম ৫.১ শতাংশ বাড়ে এবং প্রতি আউন্সে ৮৪.০৬ ডলারে পৌঁছায়, যদিও দিনের শুরুর দিকে সর্বোচ্চ ৮৪.৬০ ডলারের রেকর্ড ভাঙা হয়। রুপা ঐতিহ্যগতভাবে মুদ্রা অবমূল্যায়ন এবং মুদ্রাস্ফীতি থেকে সুরক্ষা পাওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়, তাই বর্তমান অর্থনৈতিক অস্থিরতায় এর চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্লাটিনামের দামও ৩.৩ শতাংশ বাড়ে এবং প্রতি আউন্সে ২,৩৪৮.৭৪ ডলারে স্থিত হয়। প্লাটিনাম শিল্পে বিশেষ করে গাড়ি ও গয়না খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, এবং তার দাম বৃদ্ধি মূলত স্বর্ণ ও রুপার মতোই নিরাপদ সম্পদে বিনিয়োগের প্রবণতার ফল।
প্যালাডিয়ামের দাম ২.৭ শতাংশ বাড়ে এবং প্রতি আউন্সে ১,৮৬৪.১৯ ডলারে লেনদেন হয়। প্যালাডিয়াম স্বয়ংচালিত শিল্পে ক্যাটালিটিক কনভার্টার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর সরবরাহ সংকট ও চাহিদা বৃদ্ধির ফলে দাম উর্ধ্বমুখী হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, মূল্যবান ধাতুর এই উত্থানটি বিশ্বব্যাপী আর্থিক বাজারের অস্থিরতার একটি স্পষ্ট সূচক। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি হ্রাসের জন্য স্বর্ণ, রুপা, প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়ামকে পোর্টফোলিওতে অন্তর্ভুক্ত করার দিকে ঝুঁকছেন। তবে, এই ধাতুগুলোর দাম উচ্চ মাত্রায় পৌঁছানোর ফলে ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট বাজারে সংশোধনের সম্ভাবনা রয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত দেন, যদি ভূ‑রাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকে এবং ফেডারেল রিজার্ভের নেতৃত্বের ওপর তদন্ত দীর্ঘায়িত হয়, তবে স্বর্ণ ও রুপার দাম আরও বাড়তে পারে। অন্যদিকে, কোনো ধরণের শান্তি চুক্তি বা তদন্তের সমাপ্তি বাজারে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে এনে দামকে সাময়িকভাবে কমাতে পারে।
বাজার পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বর্ণ ও রুপার মতো নিরাপদ সম্পদের চাহিদা বাড়তে থাকবে, তবে বিনিয়োগকারীদের উচিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা করে পোর্টফোলিও বৈচিত্র্য বজায় রাখা। অস্থিরতা কমলে দামের ওঠানামা তীব্র হতে পারে, তাই সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
এই তথ্যগুলো রয়টার্সের রিপোর্টের ভিত্তিতে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারের সাম্প্রতিক প্রবণতা ও বিশ্লেষণকে প্রতিফলিত করে।



