ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি মঙ্গলবার তেহরানের উচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক বৈঠকে জানিয়ে দেন, দেশের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ও অশান্তি এখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, গত সপ্তাহান্তে বিক্ষোভের সঙ্গে সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছিল, তবে নিরাপত্তা বাহিনীর হস্তক্ষেপের ফলে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে।
বৈঠকে আরাঘচি জানান, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা প্রতিবাদকে পরিকল্পিতভাবে রক্তাক্ত ও সহিংস রূপে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য একটি অজুহাত তৈরি করতে পারেন। তিনি যুক্তি দেন, এই ধরনের কৌশল আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইরানের অবস্থানকে দুর্বল করতে চায়।
আরাঘচি তেহরানের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে দেশের ইন্টারনেট পরিষেবা দ্রুত পুনরায় চালু করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান। তিনি বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে দূতাবাস ও সরকারি মন্ত্রণালয়গুলোকে প্রথমে সংযোগ ফিরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। এই পদক্ষেপের পেছনে লক্ষ্য, আন্তর্জাতিক যোগাযোগের বাধা দূর করে দেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করা।
বিক্ষোভের সূচনা ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়, যখন সরকার কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং কয়েক দিন ধরে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখে। এই সময়কালে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে পাঁচশতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে এবং হাজারো প্রতিবাদকারী গ্রেপ্তার হয়েছে, মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বার্তা পোস্ট করে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নীতিগুলোর প্রতি কঠোর সমালোচনা প্রকাশ করেন। তিনি ট্রাম্পের নাম না উল্লেখ করে, তাকে ইতিহাসের কুখ্যাত ও অহংকারী শাসকদের সঙ্গে তুলনা করেন এবং তার পতন অনিবার্য বলে উল্লেখ করেন। এই মন্তব্যকে ট্রাম্পের ‘গ্রেট ইরান’ গড়ার আহ্বানের বিপরীতে তেহরানের দৃঢ় অবস্থানের প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
ইরানের সরকার এখনো যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রয়েছে, তবে সংলাপের পথও খোলা রেখেছে, আরাঘচি বলেন। তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রেখে, ইরানের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এই অবস্থান ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপকে নিরুৎসাহিত করার উদ্দেশ্য বহন করে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র ট্রাম্পের নেতৃত্বে ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপের পরিকল্পনা করে, তবে ইরানের বর্তমান নিয়ন্ত্রণের দাবি এবং কূটনৈতিক চ্যানেলগুলোর সক্রিয়তা তার প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করবে। তেহরানের ইন্টারনেট পুনরুদ্ধার এবং কূটনৈতিক সংযোগের দ্রুত পুনঃস্থাপন আন্তর্জাতিক নজরদারির মুখে ইরানের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে।
অন্যদিকে, মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে ঘটিত মানবিক ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা দাবি করে, অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা ও গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের সংখ্যা বাড়তে থাকলে আন্তর্জাতিক সমালোচনা তীব্র হবে এবং ইরানের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উপর চাপ বাড়বে।
সামগ্রিকভাবে, আরাঘচির আজকের বক্তব্য ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে আনার প্রচেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার অবস্থান পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে নেওয়া কূটনৈতিক পদক্ষেপের প্রতিফলন। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তন, অথবা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মানবাধিকার সংক্রান্ত চাপ, ইরানের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক কৌশলকে নতুন দিকনির্দেশনা দিতে পারে।



