ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে শীতের প্রথম সপ্তাহে গরম পানির দগ্ধে শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ১০ মাসের রাইয়ান মাহমুদ, নরসিংদীর একটি ভাড়া বাসায় তার মা মহুয়া আক্তারের তত্ত্বাবধানে গরম পানি গরম করার সময় রাইস কুকার থেকে গরম পানি তার গায়ে পড়ে প্রায় ৩৫ শতাংশ দেহ দগ্ধ হয়। রাইয়ানকে গত রোববার থেকে ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে; বর্তমানে শিশুর জ্বর বাড়ছে এবং ব্যথা নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসা চালু রয়েছে।
মহুয়া আক্তার জানান, রাইয়ান মাত্র নয় মাসে হাঁটা শিখেছে এবং বাড়িতে কোনো জিনিস তার নাগালের বাইরে রাখা কঠিন। রোববার সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ ফিরে এলে তিনি গরম পানি গরম করে বাবার গোসলের জন্য প্রস্তুত করছিলেন; রাইস কুকারের সুইচ বন্ধ করার পরেও হঠাৎ করে কুকারের তার টান পেছন থেকে টেনে নেওয়া হয় এবং অর্ধেক গরম পানি রাইয়ানের গায়ে পড়ে। তিনি তৎক্ষণাৎ সাহায্য করতে পারেননি, ফলে শিশুর দেহে বিস্তৃত দগ্ধ দেখা দেয়।
রাইয়ানের পাশাপাশি শীতের তাপমাত্রা কমে যাওয়ার পর গরম পানির দগ্ধে আরও কয়েকটি শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। মাদারীপুরের দুই বছর বয়সী হুজাইফা, বাড়ির উঠানে গরম পানি ভর্তি বড় প্লাস্টিক বালতিতে খেলছিল। হঠাৎ করে বালতি উল্টে গিয়ে তার শরীরের বেশিরভাগ অংশে তীব্র দগ্ধ দেখা দেয়; প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর জেলা হাসপাতালে রেফার করা হয় এবং শেষমেশ জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়।
এক বছর দুই মাসের রাহা আক্তারও গরম পানির দগ্ধে আক্রান্ত হয়ে টাঙ্গাইল থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়েছে। তার মা মুন্নি আক্তার এবং বাবা রনি শিশুটিকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য ইনস্টিটিউটে নিয়ে গেছেন। রাহার ক্ষেত্রে গরম পানির তাপমাত্রা এবং শিশুর সংবেদনশীল ত্বকের সংযোগের ফলে তীব্র দগ্ধ দেখা দিয়েছে, যা তাত্ক্ষণিক চিকিৎসা ছাড়া গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শীতের মাসে গরম পানি ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গরম পানির দগ্ধে শিশুর সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষ করে রাইস কুকার, ইলেকট্রিক কেটলি এবং বড় প্লাস্টিক বালতি থেকে গরম পানি সরাসরি শিশুর নাগালের মধ্যে রাখা নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায়। চিকিৎসকরা অভিভাবকদের সতর্ক করছেন যে গরম পানি গরম করার সময় শিশুকে ঘরের অন্য অংশে রাখুন, গরম পানির পাত্রকে উচ্চ স্থানে রাখুন এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য থার্মোমিটার ব্যবহার করুন।
দগ্ধের পর প্রথম ২৪ ঘন্টার মধ্যে শীতল পানি দিয়ে ক্ষত ধোয়া এবং দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি, কারণ দগ্ধের গভীরতা বাড়লে সংক্রমণ এবং শক বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। ইনস্টিটিউটে ভর্তি শিশুরা বর্তমানে ব্যথা নিয়ন্ত্রণের জন্য ওষুধ, অ্যান্টিবায়োটিক এবং প্রয়োজনে ত্বক প্রতিস্থাপন শল্যচিকিৎসা পাচ্ছেন। রোগীর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রাখতে রক্তের শর্করা, ইলেক্ট্রোলাইট এবং তরল ভারসাম্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়।
শীতের সময় গরম পানির নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ এবং এনজিওগুলোকে সমন্বিত প্রচারণা চালানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। পরিবারগুলোকে গরম পানির পাত্রকে শিশুর হাতের নাগালের বাইরে রাখার পাশাপাশি, গরম পানি গরম করার সময় ঘরের আলো এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, এবং জরুরি অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসা কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য নিকটস্থ হাসপাতালের নম্বর সংরক্ষণ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
শিশুরা গরম পানির দগ্ধে ভোগা কষ্ট কমাতে সমাজের সকল স্তরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। গরম পানির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ পাত্র ব্যবহার এবং শিশুকে পর্যবেক্ষণ করা এই শীতকালে দগ্ধের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। আপনার পরিবারে গরম পানির ব্যবহার কীভাবে নিরাপদ করা যায়, তা নিয়ে চিন্তা করছেন? আপনার মতামত এবং অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন, যাতে একসাথে নিরাপদ শীতকাল গড়ে তোলা যায়।



