ঢাকার ধানমন্ডি এলাকায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সদর দফতরে সোমবার দুপুর ১১টায় একটি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে উল্লেখ করেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের তুলনায় আমলাতন্ত্রের একটি গোষ্ঠী অধিক প্রভাব রাখে। তিনি বলেন, উপদেষ্টা পরিষদ কোন নথি স্বাক্ষর করবে বা কোন সিদ্ধান্ত নেবে তা প্রকৃতপক্ষে নির্ধারণ করে না; তা সিদ্ধান্ত নেয় উচ্চপদস্থ ব্যুরোক্রেটদের গোষ্ঠী।
সম্মেলনে টিআইবির একটি পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করা হয়, যার শিরোনাম “অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ প্রণয়নে সংস্কারবিমুখতা”। এতে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে গৃহীত বেশিরভাগ অধ্যাদেশে প্রতিরোধক মহল, বিশেষ করে আমলাতন্ত্রের প্রভাবশালী অংশের চাপের মুখে সরকার নতিস্বীকার করেছে। ফলস্বরূপ, সংস্কারমূলক লক্ষ্যগুলো বিকৃত হয়েছে।
একজন সাংবাদিক সরকারকে নতিস্বীকারের কারণ জানতে চাওয়ার পর ইফতেখারুজ্জামান উত্তর দেন, এ বিষয়ে তার কাছে কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই। তবে তিনি দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে বলছেন, কোন নীতি বা আইনগত উপাদান অন্তর্ভুক্ত হবে, কোনটি বাদ পড়বে, তা মূলত ব্যুরোক্রেটিক গোষ্ঠীর সিদ্ধান্ত। এই প্রক্রিয়ায় কেবল গোষ্ঠীর স্বার্থই নয়, রাজনৈতিক স্বার্থেরও প্রতিফলন দেখা যায়।
ইফতেখারুজ্জামান টিআইবির উপস্থাপনায় উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গৃহীত অধ্যাদেশের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক উভয়ই রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সরকার একতরফাভাবে, অংশীদারদের যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত না করে অধ্যাদেশ প্রণয়ন করেছে। কিছু ক্ষেত্রে খসড়া অধ্যাদেশ স্বল্প সময়ের জন্য সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়, যাতে প্রকাশের বাধ্যবাধকতা পূরণ হয়।
বিরোধী মতামত থাকা সত্ত্বেও, কিছু অংশীদারকে পরামর্শের সুযোগ দেওয়া হয়, তবে তাদের প্রতিশ্রুত সংশোধন কোনো ব্যাখ্যা ছাড়া উপেক্ষা করা হয়। ইফতেখারুজ্জামান আরও জানিয়ে দেন, কিছু অংশীদারকে সরকারের পক্ষ থেকে অপপ্রচার করা হয়েছে, যা নীতি প্রণয়নের স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতাকে ক্ষুণ্ন করে।
টিআইবির বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, সাইবার সুরক্ষা ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা সংস্থাসহ বিভিন্ন স্বতন্ত্র সংস্থার কার্যক্রমেও ব্যুরোক্রেটিক গোষ্ঠীর প্রভাব স্পষ্ট। এই সংস্থাগুলোর স্বতন্ত্রতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার না করা পর্যন্ত, নীতিগত পরিবর্তনগুলো ব্যুরোক্রেটিক স্বার্থে বাঁকানো রয়ে যাবে।
ইফতেখারুজ্জামান শেষ করে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে গৃহীত অধ্যাদেশগুলোকে যদি সত্যিকারের সংস্কার হিসেবে গণ্য করা হয়, তবে তা কেবল তখনই সম্ভব হবে যখন ব্যুরোক্রেটিক গোষ্ঠীর অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রভাবকে সীমাবদ্ধ করা হবে এবং অংশীদারদের সঙ্গে পরামর্শের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে। তিনি টিআইবির ভবিষ্যৎ কাজের দিকনির্দেশনা হিসেবে, নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ এবং পর্যবেক্ষণমূলক প্রতিবেদন প্রকাশের পরিকল্পনা জানিয়ে দেন, যাতে সরকারী সিদ্ধান্তে ব্যুরোক্রেটিক হস্তক্ষেপ কমে এবং সংস্কারমূলক লক্ষ্য অর্জিত হয়।
এই বক্তব্যের পর, উপস্থিত সাংবাদিকরা টিআইবির পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন সম্পর্কে অতিরিক্ত প্রশ্ন করেন, তবে ইফতেখারুজ্জামান উল্লেখ করেন, প্রতিবেদনের বিশদ বিশ্লেষণ পরবর্তী প্রকাশে প্রকাশিত হবে। সম্মেলনটি শেষ হয়, এবং টিআইবির কর্মীরা অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকদের সঙ্গে নথিপত্র ও ডেটা শেয়ার করেন, যাতে ভবিষ্যতে নীতি পর্যবেক্ষণে স্বচ্ছতা বজায় থাকে।



