গতকাল রোববার প্রায় সকাল ৯টায় বাংলাদেশ সীমান্তের পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার রাখাইন রাজ্যের এক গুলিবিদ্ধ ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ৬ বছর বয়সী হুজাইফা নামের শিশুটি গুলির শিকার হয়। গুলি তার মাথায় প্রবেশ করে, ফলে শিশুটি গুরুতর আঘাত পায় এবং তাৎক্ষণিক চিকিৎসা সম্ভব না হওয়ায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়।
শিশুটিকে সন্ধ্যা ৬টায় আইসিইউতে ভর্তি করা হয় এবং সেখানে জীবন রক্ষার জন্য ভিটাল সাপোর্টে রাখা হয়। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকরা জানায়, গুলি শিশুর মস্তিষ্কে প্রবেশ করেছে, যা অপারেশনকে জটিল করে তুলেছে। গুলি সরিয়ে নেওয়া সম্ভব না হওয়ায় মস্তিষ্কের চাপ কমাতে অন্যান্য চিকিৎসা করা হয়েছে।
চিকিৎসা দল রাতের বেলা জানায়, গুলি মস্তিষ্কের গভীরে বসে আছে এবং তা অপসারণে উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। তাই শল্যচিকিৎসা চালিয়ে গুলি না বের করে, মস্তিষ্কের চাপ হ্রাসের জন্য অন্যান্য পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। অপারেশনটি ভোর ৪টা পর্যন্ত চললেও গুলি বের করা হয়নি।
হুজাইফার চাচা মোহাম্মদ এরশাদ জানান, শনিবার রাত জুড়ে গুলির শব্দে পুরো এলাকা আতঙ্কে ছিল। রোববার সকালে সামান্য শান্তি দেখা গিয়ে তিনি বাড়ি থেকে বের হন, এবং কিছুক্ষণ পর তার ভাতিজি খেলতে বের হয়। সড়কের কাছাকাছি পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে আবার গুলির শব্দ শোনা যায়, এবং গুলি শিশুর মুখের পাশে দিয়ে মাথায় ঢুকে যায়।
মিয়ানমার রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপের আশেপাশে তিন দিন ধরে বিমান, ড্রোন, মর্টার ও বোমা হামলা অব্যাহত রয়েছে। মিয়ানমার সামরিক সরকার আরাকান আর্মি (AA) এর অবস্থানে বিমান হামলা বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে।
অন্যদিকে, আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে স্থলভাগে সংঘর্ষের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই গোষ্ঠীগুলো তিনটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র দল নিয়ে গঠিত, যারা সীমান্তের পার্শ্ববর্তী এলাকায় অস্ত্রধারী সংঘর্ষে যুক্ত। ফলে সীমান্তের নিরাপত্তা অবনতির ঝুঁকি বাড়ছে।
সীমান্তবর্তী টেকনাফের গ্রামগুলোতে ধারাবাহিক বিস্ফোরণ ঘটছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি, চিংড়ি খামার এবং নাফ নদীর ওপর প্রভাব ফেলছে। মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলি ও শেলিংয়ের ফলে বাংলাদেশী জনগণ প্রায়ই শারীরিক ক্ষতি ও সম্পত্তি ক্ষতির শিকার হচ্ছে।
এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার সংস্থা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দল উভয়ই মিয়ানমারের সামরিক কার্যক্রমের তীব্রতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং বেসামরিক নাগরিকের সুরক্ষার জন্য তৎপরতা দাবি করেছে।
দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে, বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তা বিষয়ক আলোচনার জন্য কূটনৈতিক চ্যানেল সক্রিয় করেছে। বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গুলিবিদ্ধ শিশুর ঘটনা সীমান্তে অবৈধ গুলিবর্ষণ বন্ধের জন্য দ্বিপাক্ষিক আলোচনার জরুরি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
অ্যাসিয়ান দেশগুলোও এই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। অ্যাসিয়ানের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটি রাখাইন অঞ্চলে চলমান সামরিক কার্যক্রমের ফলে বেসামরিক প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ার কথা উল্লেখ করে, এবং সকল পক্ষকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের মান্যতা বজায় রাখতে আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, রাখাইন রাজ্যের সামরিক ও গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে চলমান সংঘর্ষের ফলে সীমান্তে বেসামরিক ক্ষতি বৃদ্ধি পাবে, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে শরণার্থী প্রবাহ ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের দিকে নিয়ে যাবে। তাই কূটনৈতিক সমাধান ও ত্রিপাক্ষিক সংলাপের মাধ্যমে স্থিতিশীলতা আনা জরুরি।
শিশুটির বর্তমান অবস্থা আইসিইউতে স্থিতিশীল, তবে মস্তিষ্কে গুলি বসে থাকা কারণে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজন হবে। সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো শিশুর চিকিৎসা সহায়তা বাড়ানোর জন্য তহবিল ও সরঞ্জাম সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনার প্রভাব কমাতে সহায়তা করবে।



