বোপালের হুজুর তহসিলের নায়াপুরা এলাকায় অবস্থিত ১৬.৬২ একর জমির মালিকানা নিয়ে চলা দেওয়ানি মামলায় স্থানীয় আদালত সাইফ আলী খান, শর্মিলা ঠাকুর, সোহা আলী খান এবং বোপাল রাজ পরিবারের অন্যান্য উত্তরাধিকারীদের পক্ষে রায় প্রদান করেছে। মামলাটি দীর্ঘ সময় ধরে চলছিল এবং শেষমেশ আদালত বাদীর দাবিগুলি প্রত্যাখ্যান করে সম্পূর্ণভাবে সাইফ পরিবারের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়। এই রায়ের ফলে অভিনেতা সাইফ আলী খান ও তার পরিবারকে ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত জমির সম্পূর্ণ মালিকানা পুনরায় নিশ্চিত করা হয়েছে।
নায়াপুরা এলাকা বোপালের পুরনো রাজকীয় সম্পত্তির অংশ হিসেবে পরিচিত, যেখানে বহু দশক ধরে রাজপরিবারের অধিকার স্বীকৃত ছিল। ঐ জমি ১৬.৬২ একর বিস্তৃত এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমি হিসেবে বিবেচিত। বোপালের ঐতিহাসিক রেকর্ডে এই জমি রাজপরিবারের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। তাই এই ভূমি নিয়ে কোনো বিরোধ স্বাভাবিকভাবে উচ্চ পর্যায়ের আইনি লড়াইয়ে রূপ নেয়।
মামলায় বাদী হিসেবে তিনজন স্থানীয় বাসিন্দা উপস্থিত হন, যারা দাবি করেন যে তারা এই জমির প্রকৃত মালিক। তাদের যুক্তি ছিল যে ১৯৩৬ সালে বোপালের শেষ নবাব হামিদুল্লাহ খান তাদের পিতা, মরহুম উকিল আহমেদকে এবং তাদের পূর্বপুরুষদের রাজকীয় সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ এই জমি উপহার বা ‘ইনায়েত’ হিসেবে প্রদান করেছিলেন। বাদীরা পুরনো রাজস্ব রেকর্ড এবং জমিতে দীর্ঘ সময় ধরে গৃহ নির্মাণ, কেয়ারটেকার নিয়োগের মাধ্যমে অবিচ্ছিন্ন দখল বজায় রাখার প্রমাণ উপস্থাপন করেন। তদুপরি, তারা জমির কিছু অংশ অন্যদের বসবাসের জন্য বরাদ্দ করার দাবি আদালতে পেশ করেন।
বাধ্যতামূলকভাবে জমির মালিকানা প্রমাণের জন্য বাদীরা ঐতিহাসিক নথিপত্র, পুরনো রেকর্ড এবং শারীরিক দখলের প্রমাণাদি আদালতে উপস্থাপন করেন। তবে আদালত তাদের উপস্থাপিত নথিগুলি পর্যবেক্ষণ করে দেখেন যে ১৯৩৬ সালের উপহারের দাবিকে সমর্থন করার জন্য যথাযথ প্রমাণের অভাব রয়েছে। বাদীরা যে পুরনো রাজস্ব রেকর্ড দেখিয়েছেন, তা মূলত কর সংগ্রহের তথ্য এবং জমির ব্যবহারিক দিকের রেকর্ড, যা উপহারের আইনি স্বীকৃতি দেয় না। ফলে আদালত বাদীর দাবিকে অযোগ্য ঘোষণা করে।
অধিকন্তু, আদালত ১৯৪৯ সালে ভারত সরকারের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বোপাল মার্জার চুক্তি (বোপাল অন্তর্ভুক্তি চুক্তি) উল্লেখ করে, যেখানে এই জমি স্পষ্টভাবে মনসুর আলী খান পাটৌদি ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিল। চুক্তিতে উল্লেখিত এই ধারা অনুযায়ী জমির মালিকানা ঐতিহাসিকভাবে পাটৌদি পরিবারের হাতে ছিল বলে আদালত রায়ে উল্লেখ করে। এই চুক্তি বোপালের রাজ্যকে ভারতীয় সংবিধানের অধীনে একীভূত করার সময়ের গুরুত্বপূর্ণ নথি, যা জমির মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। ফলে, আদালত পাটৌদি পরিবারের স্বত্বকে আইনগতভাবে স্বীকৃতি দেয়।
পরিবারিক বণ্টনের পর ১৯৯৮ সালে মনসুর আলী খান পাটৌদি এবং তার পরিবার এই জমির ১২.৬২ একর অংশ এক নির্মাতার কাছে বিক্রি করে দেন। বিক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই বর্তমান মামলাটি দায়ের করা হয়, যা মূলত বিক্রয়কৃত অংশের মালিকানা নিয়ে পুনরায় প্রশ্ন তুলতে চেয়েছিল। তবে আদালত উল্লেখ করে যে বিক্রয় চুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে, ফলে মামলায় নতুন কোনো অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এই বিষয়টি আদালতের রায়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আদালতের চূড়ান্ত রায়ে বলা হয়েছে যে বাদীরা ১৯৩৬ সালের উপহারের দাবিকে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং ১৯৪৯ সালের মার্জার চুক্তিতে জমির মালিকানা পাটৌদি পরিবারের নামে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। রায়ের ভিত্তিতে সাইফ আলী খান ও তার পরিবারকে সম্পূর্ণ জমির মালিকানা পুনরায় নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া, আদালত উল্লেখ করে যে ভবিষ্যতে কোনো বিরোধ এড়াতে সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও রেজিস্ট্রেশন করা উচিত। এই রায়ের ফলে বোপালের ঐতিহাসিক সম্পত্তি সংক্রান্ত এক দীর্ঘমেয়াদী বিরোধ শেষ হয়েছে।
বিনোদন জগতের পরিচিত অভিনেতা সাইফ আলী খান, যিনি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বহু হিট চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন, এখন এই রায়ের মাধ্যমে তার পারিবারিক সম্পত্তি সংক্রান্ত আইনি নিরাপত্তা পেয়েছেন। তার পরিবারিক ঐতিহ্য এবং রাজপরিবারের সঙ্গে সংযোগের ফলে এই জমি তার জন্য কেবল আর্থিক সম্পদ নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। রায়ের পর সাইফ পরিবারের সদস্যরা জমির উন্নয়ন ও সংরক্ষণে নতুন পরিকল্পনা তৈরির কথা প্রকাশ করেছেন। এই পরিকল্পনা ভবিষ্যতে স্থানীয় সমাজের জন্য কর্মসংস্থান ও অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে।
বোপালের স্থানীয় বাসিন্দারা রায়ের পরামর্শে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন; কিছুজন রায়কে স্বাগত জানিয়ে জমির স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা আশা করছেন, অন্যদিকে কিছুজন অতীতের বিরোধের পুনরাবৃত্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে অধিকাংশেই আশা করছেন যে এখন জমির মালিকানা স্পষ্ট হওয়ায় এলাকার উন্নয়ন কাজ দ্রুত এগিয়ে যাবে। স্থানীয় প্রশাসনও রায়ের পর জমির ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও পরিকল্পনা প্রণয়নে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, এই মামলার সমাপ্তি বোপালের ঐতিহাসিক জমি সংক্রান্ত এক জটিল বিরোধকে সমাধান করেছে এবং অভিনেতা সাইফ আলী খান ও পাটৌদি পরিবারের জন্য আইনি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেছে। ভবিষ্যতে এই ধরনের বিরোধ এড়াতে নথিপত্রের যথাযথ রেজিস্ট্রেশন এবং সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ হবে। এই রায়ের মাধ্যমে বোপালের রাজকীয় ঐতিহ্য এবং আধুনিক আইনি কাঠামোর সমন্বয় ঘটেছে, যা স্থানীয় সমাজের জন্য একটি মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে।



