ইরানের বিভিন্ন শহরে ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া প্রতিবাদগুলো দ্রুত দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে নাগরিকরা সরকারকে পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছেন। ইরানীয় নিরাপত্তা বাহিনী প্রতিবাদকারীদের দমন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পরিস্থিতি নিয়ে ইরানীয় কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছেন যে, তারা যদি দমন-হিংসা চালিয়ে যায় তবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ও সহযোগীদের ওপর আক্রমণের হুমকি থাকবে।
প্রতিবাদগুলো প্রথমে তেহরানের কেন্দ্রীয় অংশে ডলার-রিয়াল বিনিময় হার নিয়ে উদ্বেগের কারণে শুরু হয়, যেখানে বাজারের ব্যবসায়ীরা মুদ্রা অবমূল্যায়নের প্রতিবাদে ধর্মঘটের আহ্বান জানায়। এরপর এই আন্দোলন দ্রুত দেশের পশ্চিমাঞ্চলের গরীব অঞ্চলগুলোতে বিস্তৃত হয়, যেখানে পূর্বে ২০২২ সালের মহিলাদের অধিকার সংক্রান্ত প্রতিবাদ এবং ২০০৯ সালের গ্রিন মুভমেন্টের মতো বড় আন্দোলনগুলো সীমিত ছিল।
বিশ্লেষক ও সমাজবিজ্ঞানী এলি খোরসান্দফার উল্লেখ করেন, এই সময়ের প্রতিবাদগুলো পূর্বের তুলনায় বিস্তৃত ও তীব্র, কারণ এখন ছোট শহর ও গ্রামাঞ্চলের নামও শোনা যাচ্ছে, যেগুলো আগে কখনো রাজনৈতিক মঞ্চে দেখা যায়নি। তিনি বলেন, ২০২২ সালের মহিলাদের অধিকার আন্দোলনের পর থেকে ইরানের সামাজিক কাঠামোতে গভীর পরিবর্তনের চাহিদা গড়ে উঠেছে, এবং বর্তমান প্রতিবাদগুলোও একই ধারা অনুসরণ করছে।
ইরানের সরকার ২০০৯, ২০১৭ ও ২০১৯ সালের পূর্ববর্তী প্রতিবাদগুলোকে সীমিত করে দেখেছে, যেখানে মূলত বড় শহরগুলোতে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে ২০২২ সালের মাহশা আমিনের মৃত্যুর পরের প্রতিবাদগুলো দ্রুত তীব্রতা পায়, এবং এখন ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শুরু হওয়া এই নতুন আন্দোলন অর্থনৈতিক সমস্যার পাশাপাশি সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবি করে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মন্তব্যে ইরানীয় কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছে যে, যদি তারা প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত হিংসা চালিয়ে যায়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের ওপর আক্রমণের সম্ভাবনা বাড়বে। এই সতর্কতা ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে, এবং তারা এখনো স্পষ্ট পদক্ষেপ না নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।
প্রতিবাদকারীরা মূলত মুদ্রা অবমূল্যায়ন, দারিদ্র্য, এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভাবের বিরুদ্ধে একত্রিত হয়েছে। তেহরানের কেন্দ্রীয় বাজারে ধর্মঘটের পর থেকে, প্রতিবাদগুলো অন্যান্য শহরে, বিশেষ করে ইরানের গরিব পশ্চিমাঞ্চলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। এই অঞ্চলে পূর্বে গরিব জনগণের প্রতিবাদ সীমিত ছিল, তবে এখন তারা সরকারকে সম্পূর্ণ পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছে।
ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিক্রিয়া এখনও সম্পূর্ণ স্পষ্ট নয়, তবে তারা অতিরিক্ত দমনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, যা অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকরা ভবিষ্যতে এই প্রতিবাদগুলো কীভাবে বিকাশ করবে তা নিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করছেন। কিছু মতামত অনুযায়ী, যদি সরকার দমনমূলক নীতি অব্যাহত রাখে, তবে প্রতিবাদগুলো আরও বিস্তৃত হতে পারে এবং সম্ভবত রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকে ধাবিত হবে। অন্যদিকে, যদি সরকার সংলাপের মাধ্যমে সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারে, তবে অস্থিরতা কমে যেতে পারে।
ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৪৭ বছরের বেশি সময়ে এ ধরনের ব্যাপক ও সমন্বিত প্রতিবাদ আগে দেখা যায়নি, এবং বর্তমান পরিস্থিতি দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সরকার, নিরাপত্তা বাহিনী এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে যে, ইরান এই সংকট থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসবে।



