ঢাকা শহরের বিভিন্ন পাড়া—ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, নিউ মার্কেট, হাজারিবাগ, গাবতলি, খিলগাঁও ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় গ্যাস সরবরাহের ধারাবাহিক ঘাটতি বাড়ি গৃহস্থালির দৈনন্দিন রান্নার ব্যয়কে বাড়িয়ে তুলেছে। পাইলাইন গ্যাসের প্রবাহ কমে যাওয়ায় এবং বোতলজাত লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এর ঘাটতি ও দাম বৃদ্ধির ফলে বহু পরিবার বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকেছে।
এই সমস্যার মূল কারণ হল পাইপলাইন নেটওয়ার্কে লিক ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের বিলম্ব, যা গত সপ্তাহে শুরু হওয়া প্রযুক্তিগত সমস্যার পর থেকে বাড়ি-ঘরে গ্যাসের সরবরাহকে অস্থায়ীভাবে সীমিত করে দিয়েছে। একই সঙ্গে এলপিজি সিলিন্ডারের সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাতের ফলে বাজারে সিলিন্ডারের অভাব ও দাম দুগুণের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
অনেক গ্যাস ব্যবহারকারী পরিবার এখন দিনে মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টা গ্যাস পায়, এবং তা সাধারণত রাতের দেরি বা ভোরের প্রথম দিকে সীমিত থাকে। বাকি সময়ে চুলা শীতল থাকে, ফলে রান্নার কাজ সম্পূর্ণভাবে ইলেকট্রিক স্টোভ বা রাইস কুকারে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।
মোহাম্মদপুরের এক বাসিন্দা, যিনি গত মঙ্গলবার থেকে গ্যাসের সম্পূর্ণ ঘাটতি অনুভব করছেন, জানান যে শনিবার রাতের কাজের পরেও পরের সকালে মাত্র একবারই ছোট জ্বালানি দেখা গিয়েছিল, এরপর আবার সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পরিবারটি রাইস কুকার দিয়ে মাত্র একবারের খাবার প্রস্তুত করতে পেরেছে।
এলপিজি সিলিন্ডার না পাওয়া ও দামের দ্রুত বৃদ্ধি তাদেরকে প্রায় প্রতিদিনই বাইরে থেকে নাস্তা ও রাতের খাবার কিনতে বাধ্য করেছে। রেস্টুরেন্টের লম্বা সারিতে দাঁড়িয়ে সময়ের ক্ষতি এবং কর্মস্থলে দেরি হওয়া তাদের আর্থিক চাপকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
কাঠালবাগানে ২০১৮ সাল থেকে বসবাসরত এক গৃহস্থালির প্রধান জানান, এ পর্যন্ত গ্যাসের কোনো বড় সমস্যার মুখোমুখি হননি; তবে এখন প্রথমবারের মতো তিনি অর্ধেক রান্না করা চাল নষ্ট করতে বাধ্য হচ্ছেন, কারণ গ্যাসের সরবরাহ সীমিত হওয়ায় খাবার সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত করা সম্ভব হচ্ছে না।
পশ্চিম ধানমন্ডির আরেক পরিবারে দুই-বার্নার গ্যাস চুলা ৭ জানুয়ারি রাত থেকে সম্পূর্ণ শীতল অবস্থায় রয়েছে। ৮ জানুয়ারি রাত ১০টায় কম চাপের গ্যাস সাময়িকভাবে ফিরে আসে, তবে পরের সকালে আবার দুর্বল চাপের কারণে বন্ধ হয়ে যায় এবং শনিবার সকাল থেকে আবার সরবরাহ বন্ধ থাকে। পরিবারের স্ত্রী ইলেকট্রিক চুলা কেনার পরামর্শ দিচ্ছেন, কারণ গ্যাসের অনিশ্চয়তা বাড়ি-ঘরের রান্না প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে।
বেশিরভাগ গৃহস্থালির বেতন সীমিত, এবং গ্যাসের ঘাটতি ও উচ্চ দামের ফলে তাদের আয়ের বড় অংশই জ্বালানি খরচে ব্যয় হচ্ছে। ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ বিলের বৃদ্ধি অনিবার্য, যা আর্থিক ভারকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।
রেস্টুরেন্ট ও স্ট্রিট ফুড বিক্রেতাদের ক্ষেত্রে গ্যাসের ঘাটতি গ্রাহকদের বাড়িতে খাবার না পারার ফলে চাহিদা বাড়িয়েছে, তবে একই সঙ্গে গ্যাস সিলিন্ডারের দাম বাড়ার ফলে তাদের অপারেশনাল খরচও বেড়েছে। এলপিজি সরবরাহকারী কোম্পানিগুলি এখন চাহিদা ও সরবরাহের অমিল সামলাতে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি, যা বাজারে মূল্য অস্থিরতা সৃষ্টি করছে।
দীর্ঘমেয়াদে গ্যাসের ধারাবাহিক ঘাটতি বাড়ি-ঘরে ইলেকট্রিক চুলার ব্যবহার বাড়িয়ে তুলতে পারে, ফলে বিদ্যুৎ গ্রিডের উপর চাপ বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে গৃহস্থালির আর্থিক অবস্থা দুর্বল হলে বিদ্যুৎ বিলের বকেয়া বাড়ার ঝুঁকি থাকবে, যা ইউটিলিটি কোম্পানির নগদ প্রবাহকে প্রভাবিত করতে পারে।
অবস্থা স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহের পুনরুদ্ধার, এলপিজি সিলিন্ডারের সুষ্ঠু বিতরণ এবং দাম নিয়ন্ত্রণের জন্য নীতি নির্ধারকদের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। না হলে গৃহস্থালির ব্যয়বহুল জ্বালানি খরচ বাড়তে থাকবে, যা ভোক্তা ব্যয়ের কাঠামো ও বাজারের সামগ্রিক চাহিদাকে প্রভাবিত করবে।
সংক্ষেপে, গ্যাসের ঘাটতি এবং এলপিজি সংকটের ফলে ঢাকা শহরের গৃহস্থালি ও ব্যবসায়িক সেক্টরে ব্যয় বৃদ্ধি, বিকল্প জ্বালানির দিকে রূপান্তর এবং বিদ্যুৎ চাহিদার উত্থান প্রত্যাশিত, যা নীতি ও বাজার উভয়েরই সতর্কতা প্রয়োজন।



