ড. মুহাম্মদ ইউনূস, যিনি ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রধান উপদেষ্টা পদে শপথ নেবেন, রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় শিনজো আবের বিধবা আকিয়ে আবের সঙ্গে বৈঠকে তার নির্বাচনের পরের কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন।
বৈঠকে উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার জানান, আকিয়ে আবে ড. ইউনূসের কাছ থেকে নির্বাচনের পরের তিনটি অগ্রাধিকার সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। ড. ইউনূস উত্তর দেন, ক্ষমতা হস্তান্তরের পর তিনি তিনটি ক্ষেত্রের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেবেন।
প্রথম অগ্রাধিকার হবে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর নারীদের জন্য অনলাইন স্বাস্থ্যসেবার প্রবেশযোগ্যতা বাড়াতে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে, যাতে গ্রামীণ ও দূরবর্তী এলাকায় চিকিৎসা সেবা সহজে পৌঁছায়। এছাড়া, বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের জন্যও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পরিবারের স্বাস্থ্যের তথ্য ট্র্যাক করার ব্যবস্থা করা হবে।
দ্বিতীয় দিকটি তরুণ উদ্যোক্তাদের সমর্থন। ড. ইউনূসের মতে, যুবসমাজকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা এবং বাজার সংযোগের সুযোগ বাড়ানো হবে, যাতে নতুন ব্যবসা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।
তৃতীয় অগ্রাধিকার ‘থ্রি জিরো’ ধারণা—দূষণমুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, রোগমুক্ত সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে চলমান উদ্যোগ—কে অব্যাহত রাখা হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই নীতি বাস্তবায়নে সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারদের সমন্বয় প্রয়োজন।
বৈঠকে ড. ইউনূস শিনজো আবের গুলিতে নিহত হওয়া এবং তার পরিবারে গভীর শোক প্রকাশ করেন, এবং আকিয়ে আবের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বললেন, এই ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাধ্যমে তিনি জাপানের সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্প সম্পর্কে আরও জানার সুযোগ পেয়েছেন।
ড. ইউনূসের পরিকল্পনা অনুযায়ী, তিনি মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে সাসাকাওয়া ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে জাপান সফর করবেন। সাসাকাওয়া ফাউন্ডেশন ওশিয়ান রিসার্চে বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্র গবেষণায় সক্রিয়। সফরের সময় তিনি একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নেবেন।
সামিটিতে তিনি বাংলাদেশের ওশিয়ান গবেষণার বর্তমান অবস্থা উপস্থাপন করবেন এবং জাপানের সঙ্গে প্রযুক্তি, ডেটা শেয়ারিং এবং সমুদ্র সংরক্ষণে সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করবেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশীয় সমুদ্র সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও টেকসই উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা লক্ষ্য।
বিপক্ষের কিছু রাজনৈতিক দল ড. ইউনূসের পরিকল্পনা সম্পর্কে সতর্কতা প্রকাশ করেছে। তারা উল্লেখ করেছে, নির্বাচনের পর নতুন নীতি বাস্তবায়নে সময় ও সম্পদের যথাযথ বণ্টন নিশ্চিত করা দরকার, এবং জনসাধারণের তত্ত্বাবধান বজায় রাখা হবে। তবে তারা ড. ইউনূসের ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা ও যুব উদ্যোক্তা উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে স্বাগত জানিয়েছে।
অবশ্যই, ড. ইউনূসের তিনটি অগ্রাধিকার দেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা গ্রামীণ এলাকায় চিকিৎসা সেবার ফাঁক কমাবে, যুব উদ্যোক্তা উদ্যোগ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, আর ‘থ্রি জিরো’ নীতি সামাজিক সমতা ও পরিবেশ সংরক্ষণে সহায়তা করবে।
সফল বাস্তবায়নের জন্য সরকারী সংস্থা, বেসরকারি সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বিত কাজের প্রয়োজন হবে। ড. ইউনূসের জাপান সফর এই সমন্বয়কে শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অবশেষে, নির্বাচনের ফলাফল ও ড. ইউনূসের নতুন দায়িত্ব দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে নতুন দিকনির্দেশে নিয়ে যাবে। তার পরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং জাপান সফরের ফলাফল কীভাবে দেশের নীতি গঠনে প্রভাব ফেলবে, তা আগামী মাসে নজরে থাকবে।



