কুমিল্লা রেলওয়ে স্টেশনের কাছে গত ৭ জানুয়ারি সুবর্ণ এক্সপ্রেসে পাথর আঘাতের ফলে চারজন যাত্রী আহত হন। এ ঘটনার আগে গত এক বছরে একই ধরনের অপরাধে অর্ধশতাধিক যাত্রী আহত হয়েছেন, যা দেশের রেলপথে পাথর নিক্ষেপের সমস্যাকে পুনরায় উন্মোচিত করেছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, গত পাঁচ বছরে প্রায় দুই হাজারবার পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে ট্রেনের দরজা, জানালা ভেঙে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বহু যাত্রী গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে এই অপরাধের ফলে মৃত্যুও ঘটেছে।
নিয়মিত রেলযাত্রী কামরুল ইসলাম, যিনি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত, বলেন, “ট্রেনের নিরাপত্তা ও আরামদায়কতা নিয়ে অধিকাংশ মানুষই রেলগাড়ি বেছে নেয়, তবে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা আমাদের মধ্যে ভয় ও আতঙ্কের সঞ্চার ঘটাচ্ছে।” তিনি উল্লেখ করেন, বন্ধুরা সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে কখনও কখনও এমন ঘটনা দেখেছেন, যা যাত্রীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে আইনের ধারা ১২৭ অনুযায়ী, ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের অপরাধে সর্বোচ্চ সাজা হল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং দশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা। যদি নিক্ষেপের ফলে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে, তবে ধারা ৩০২ অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।
রেলপুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বেশিরভাগই নিরিবিলি বা গ্রামীণ এলাকায় ঘটে, যেখানে রেললাইন সংলগ্ন বাড়ি থেকে কেউ পাথর তুলে ট্রেনে নিক্ষেপ করে। অনেক সময় এটি দুষ্টুমির ছলে করা হয়, এবং ৭০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতিতে চলমান ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ করা হলে তা তৎক্ষণাৎ থামানো কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন উল্লেখ করেন, উপমহাদেশে ট্রেন চালুর পর থেকে, ১৮৫৩ সাল থেকে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা রেকর্ড করা হচ্ছে। তিনি বলেন, উন্নত দেশেও একই ধরনের অপরাধের রেকর্ড রয়েছে, তবে বর্তমান সময়ে এই সমস্যার সমাধানে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
রেল বিভাগ বর্তমানে ট্র্যাকের আশপাশের ঘরবাড়ি ও জমি পরিষ্কার করার পাশাপাশি, নজরদারি ক্যামেরা ও সিগন্যাল সিস্টেমের উন্নয়ন করে অপরাধী সনাক্ত করার চেষ্টা করছে। তদুপরি, রেলস্টেশন ও রেললাইন সংলগ্ন এলাকায় সচেতনতা বাড়াতে জনসাধারণকে সতর্ক করা হচ্ছে, যাতে পাথর নিক্ষেপের মতো হিংসাত্মক কাজের প্রতি বিরোধিতা করা যায়।
অধিকন্তু, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় পুলিশ ও গ্রাম পরিষদের সমন্বয়ে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এই টাস্কফোর্সের কাজ হল সন্দেহজনক কার্যকলাপের তদারকি, দ্রুত প্রতিক্রিয়া প্রদান এবং অপরাধীকে আইনের শাসনে আনা।
পাথর নিক্ষেপের ফলে ট্রেনের গতি কমে যাওয়া, যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং যাত্রা বিলম্বের পাশাপাশি রেলসেবা ব্যবস্থার ওপর আর্থিক ক্ষতি হয়। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের মতে, এই ধরনের অপরাধের ফলে রেলগাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং সেবার মান হ্রাস পায়।
সাম্প্রতিক ঘটনায় আহত চারজনের মধ্যে দুইজন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, অন্য দুইজন হালকা আঘাত পেয়ে পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। রেলওয়ে চিকিৎসা সেবা দ্রুত প্রদান করেছে এবং আহতদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়েছে।
অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে রেলওয়ে ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। ভবিষ্যতে পাথর নিক্ষেপের মতো হিংসাত্মক কাজের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা বজায় রেখে, রেলগাড়ি যাত্রার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।



