ইরানের বিভিন্ন শহরে চলমান প্রতিবাদে ৫০০ের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, মানবাধিকার সংস্থা HRANA রবিবার প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ৪৯০ জন প্রতিবাদকারী এবং ৪৮ জন নিরাপত্তা কর্মীর মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। এই সংঘাতের ফলে দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রায় ১০,৬০০ জন গ্রেপ্তার হয়েছে।
ইরান সরকার এখনও কোনো সরকারি মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশ করেনি, এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স স্বতন্ত্রভাবে এই সংখ্যাগুলি যাচাই করতে পারেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এই পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের ব্রিফিং গ্রহণ করেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল অনুসারে, ট্রাম্পের উপদেষ্টারা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক আক্রমণ, গোপন সাইবার অস্ত্র ব্যবহার, নিষেধাজ্ঞা বৃদ্ধি এবং বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর অনলাইন সহায়তা সহ বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করেছেন।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকর কালীবাফ, যিনি রেভলিউশনারি গার্ডের প্রাক্তন কমান্ডার, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিকে “ভুল হিসাব” বলে সতর্ক করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, যদি ইরানের ওপর কোনো আক্রমণ হয়, তবে ইসরায়েলসহ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও জাহাজগুলোকে বৈধ লক্ষ্য হিসেবে গণ্য করা হবে।
প্রতিবাদগুলো ২৮ ডিসেম্বর দামের দ্রুত বৃদ্ধি নিয়ে শুরু হয়, তবে দ্রুতই ধর্মীয় শাসকদের নীতি ও শাসন পদ্ধতির বিরুদ্ধে রূপান্তরিত হয়। ২০২২ সালের সর্ববৃহৎ প্রতিবাদগুলোর পর এই আন্দোলনটি দেশের রাজনৈতিক কাঠামোর গভীরে প্রবেশ করেছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে এই অশান্তির মূল দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করে, এবং সোমবার একটি জাতীয় সমাবেশের আহ্বান জানায় যাতে “যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দ্বারা পরিচালিত সন্ত্রাসী কার্যকলাপ”ের নিন্দা করা হয়।
ইন্টারনেট সংযোগের ব্যাপক বাধা বৃহস্পতিবার থেকে কার্যকর হয়েছে, যা তথ্যের প্রবাহকে কঠিন করে তুলেছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা কঠিন করে দিয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা ভিডিওতে দেখা যায়, তেহরানের রাস্তায় রাতের বেলায় বিশাল ভিড় গর্জন করে চলছে, অংশগ্রহণকারীরা হাততালি দিয়ে এবং নাদানী স্লোগান দিয়ে একে অপরকে উত্সাহিত করছে। এক অংশগ্রহণকারী বলছেন, “এই ভিড়ের কোনো শুরু নেই, কোনো শেষ নেই।” মাশহাদের উত্তরের শহরে ধোঁয়ার দৃশ্যও ক্যামেরায় ধরা পড়েছে।
আঞ্চলিক বিশ্লেষক রাশিদ আহমেদ, যিনি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, মন্তব্য করেন, “ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকি একত্রে অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিবেশকে অস্থির করে তুলতে পারে, বিশেষ করে যখন ইসরায়েল ও গলফ দেশগুলো ইতিমধ্যে উত্তেজনার শিখায় রয়েছে।” তিনি আরও যোগ করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য জরুরি যে ডিপ্লোম্যাটিক চ্যানেলগুলো খুলে রাখা এবং সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে সংলাপের পথ অনুসন্ধান করা উচিত।
ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক কূটনীতিকদের জন্য একটি জটিল চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করছে। যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সাইবার আক্রমণ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে আরও চাপের মধ্যে ফেলতে পারে, যা বিদ্যমান সামাজিক অশান্তিকে তীব্রতর করতে পারে। একই সঙ্গে, ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকারের সতর্কতা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোর সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হওয়ার ইঙ্গিত দেয়, যা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর নিরাপত্তা নীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের মাত্রা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হস্তক্ষেপের পরিধি নির্ধারণ করবে যে এই সংঘাতটি সামরিক সংঘর্ষে রূপ নেবে নাকি রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান হবে।



