১১ জানুয়ারি ২০০৭‑এ রাষ্ট্রপতি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন, ফলে দেশের রাজনৈতিক কাঠামোতে এক ব্যতিক্রমী পর্যায়ের সূচনা হয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে বিদায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদত্যাগ করে, নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়, যার গঠন প্রক্রিয়ায় সামরিক বাহিনীর সক্রিয় সমর্থন ছিল বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়।
২০০৬ সালের শেষের দিকে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী প্রক্রিয়া, নির্বাচন কমিশনের স্বতন্ত্রতা এবং ভোটার তালিকার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে তীব্র বিরোধে জর্জরিত হয়। বিরোধী জোটের নেতৃত্বাধীন প্রতিবাদ, রেলওয়ে ও সড়ক অবরোধ, এবং সহিংস সংঘর্ষের ফলে জনজীবন বিশৃঙ্খলায় ডুবে যায়। এই পরিস্থিতিতে ২২ জানুয়ারি ২০০৭‑এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে এবং পরে তা স্থগিত করা হয়।
জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর, বিদায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের কাজ দ্রুত এগিয়ে যায়। গঠনের পেছনে সেনাবাহিনীর সমর্থন ও অংশগ্রহণের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যদিও সরাসরি সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এই সময়কালকে ‘এক‑এগারো’ নামে পরিচিত করা হয়, যা প্রায় দুই বছর ধরে দেশের রাজনীতি, নির্বাচন ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ধারণাকে প্রভাবিত করে।
সেই দিন বিকেলে, সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ এবং নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ কয়েকজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা রাষ্ট্রপতির অফিস, বঙ্গভবনে গমন করেন। সেখানে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে জরুরি অবস্থা জারির প্রস্তাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
মঈন ইউ আহমেদ পরবর্তীতে ‘শান্তির স্বপ্নে: সময়ের স্মৃতিচারণ’ শিরোনামের একটি স্মৃতিকথা প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি ওই বৈঠকের বিবরণ দেন। বইতে তিনি উল্লেখ করেন যে, রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ইয়াজউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে বৈঠকে জরুরি অবস্থা জারির প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল চৌধুরী ফজলুল বারী। তিনি তৎকালীন নির্বাচনের সম্ভাব্য সহিংসতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি সম্পর্কে তথ্য প্রদান করেন এবং রাষ্ট্রপতিকে জানিয়ে দেন যে, ২২ জানুয়ারি নির্বাচনের ফলে ব্যাপক অশান্তি ও প্রাণহানি হতে পারে।
সামরিক কর্মকর্তারা সমগ্র পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে, দেশের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে জরুরি অবস্থা প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে নির্বাচনের সময়সূচি স্থগিত হয় এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থা থেকে দেশকে রক্ষা করার উদ্দেশ্য প্রকাশ পায়।
বিরোধী জোটের নেতারা জরুরি অবস্থা ঘোষণাকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর আক্রমণ হিসেবে সমালোচনা করেন। তারা দাবি করেন যে, নির্বাচনের দেরি এবং সামরিক সমর্থনযুক্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশের রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনকে ক্ষুণ্ন করে। তবে সরকার পক্ষ থেকে যুক্তি দেয় যে, দেশের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য এই পদক্ষেপ অপরিহার্য ছিল।
‘এক‑এগারো’ সময়কালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচনী সংস্কার, দুর্নীতি বিরোধী অভিযান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য বেশ কিছু নীতি প্রয়োগ করে। এই নীতিগুলো পরবর্তী নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গৃহীত হয়।
এই সময়ের শেষের দিকে, ২০০৯ সালে সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারী কাঠামো পুনর্গঠন করা হয়। তবে ‘এক‑এগারো’ সময়কালে গৃহীত পদক্ষেপ ও সামরিকের ভূমিকা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সিভিল-সেনা সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলেছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে, এই দুই বছরের ব্যতিক্রমী সময়কাল নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, ভোটার তালিকার নির্ভরযোগ্যতা এবং নির্বাচন কমিশনের স্বতন্ত্রতা নিয়ে আলোচনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। একই সঙ্গে, সামরিকের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সীমা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা তীব্র করেছে।
ভবিষ্যতে দেশের রাজনৈতিক পার্টিগুলোকে ‘এক‑এগারো’ সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে, স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার চালিয়ে যেতে হবে। এভাবে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী হবে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা কমবে।



