পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ শনিবার (১০ জানুয়ারি) জিও টিভিতে এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করার সিদ্ধান্তকে ‘অপহরণ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি যুক্তি দেন, যদি একই ধরনের পদক্ষেপ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে নেওয়া হতো, তবে তা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে ন্যায়সঙ্গত হতো। আসিফের মন্তব্যের পটভূমিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ভেনেজুয়েলান অপারেশন এবং তার পরবর্তী রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ছিল মাদুরোর পরিবর্তে নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করে কোনো আদালতে তার বিচার নিশ্চিত করা। এই বক্তব্য পাকিস্তানের নিরাপত্তা নীতি এবং আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে।
আসিফ ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানকে কঠোরভাবে নিন্দা করেন এবং মাদুরোর গ্রেপ্তারকে আন্তর্জাতিক নীতির লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, মাদুরোর ওপর আনা মাদক পাচার অভিযোগের ভিত্তি দুর্বল এবং তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ হতে পারে। এছাড়া, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ বিষয়ের হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখেন, যা দেশের সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ন করে। আসিফের মতে, এমন হস্তক্ষেপের ফলে অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বাড়তে পারে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত অন্য দেশের শাসন কাঠামোকে সম্মান করা এবং কূটনৈতিক পথে সমস্যার সমাধান খোঁজা।
মাদুরোর গ্রেপ্তারকে ‘অপহরণ’ বলে সমালোচনা করার পাশাপাশি, আসিফ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে একই রকম পদক্ষেপ ন্যায়সঙ্গত হবে। তিনি যুক্তি দেন, নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিক অপরাধে, বিশেষ করে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং গৃহযুদ্ধের সময় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধে দায়ী। তাই, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত তাকে গ্রেপ্তার করে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। আসিফের এই দাবিটি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের প্রতি তার অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র সত্যিকারের ন্যায়বিচার অনুসরণ করে, তবে তাকে সকল নেতার বিরুদ্ধে সমানভাবে আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত মানদণ্ডের প্রতি সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলায় অভিযানটি কয়েক দিন আগে শেষ হয়, যেখানে নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাকে মাদক পাচার সংক্রান্ত অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সরকার দাবি করে যে মাদুরো ও তার শাসনকর্তা দল আন্তর্জাতিক মাদক বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত এবং তা অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে। এই অভিযানের পর মাদুরো ধারাবাহিকভাবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন এবং তার গ্রেপ্তারকে রাজনৈতিক প্রতিশোধ হিসেবে দেখছেন। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, কিছু দেশ এটি বৈধ নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকার করেছে, আবার অন্যরা এটি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে সমালোচনা করেছে।
মাদুরোর পক্ষ থেকে ধারাবাহিক অস্বীকৃতি এবং তার গ্রেপ্তারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ বলে দাবি করা, আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতা বাড়িয়ে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগের ভিত্তিতে মাদুরোর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে এবং তাকে আন্তর্জাতিক আদালতে হাজির হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে, মাদুরো এবং তার সমর্থকরা দাবি করেন, এই মামলাটি ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ বিষয়ের ওপর বিদেশি হস্তক্ষেপের একটি উদাহরণ। এই বিরোধের ফলে ভেনেজুয়েলা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ওপর চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ভবিষ্যতে কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা কমে গেছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, এই বিষয়টি মানবাধিকার সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক আইনি সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, যারা উভয় পক্ষের যুক্তি বিশ্লেষণ করে ন্যায়সঙ্গত সমাধানের আহ্বান জানাচ্ছেন।
আসিফের মন্তব্যের ফলে পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ওপর নতুন প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। পাকিস্তান সরকার পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতি ও কূটনৈতিক পদক্ষেপে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেছে, এবং এই নতুন মন্তব্য তা আরও দৃঢ় করেছে। বিশেষ করে, পাকিস্তানের নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় এখন যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলায় হস্তক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করে, যা ভবিষ্যতে সামরিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে বিতর্ক বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা কাঠামোকে প্রভাবিত করতে পারে। আসিফের এই অবস্থান পাকিস্তানের নিজস্ব কূটনৈতিক স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক আইনি নীতির প্রতি তার প্রতিশ্রুতিকে প্রতিফলিত করে।
সারসংক্ষেপে, খাজা আসিফের বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলায় হস্তক্ষেপের বৈধতা এবং ইসরায়েলি নেতার ওপর সমান আইনি পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা উভয়ই তুলে ধরেছে। তার মন্তব্য আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ডের প্রতি সমতা বজায় রাখার আহ্বান জানায় এবং বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশে কূটনৈতিক সমঝোতার গুরুত্বকে পুনরায় জোর দেয়। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের পদক্ষেপের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কূটনৈতিক নীতি কীভাবে পরিবর্তিত হবে, তা নজরে থাকবে।



