রাজশাহী জেলার বহরমপুর এলাকায় বাস করা নুরুল ইসলাম, এইচএসসি পাশের শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নিজেকে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থাপন করে বহু রোগীর চিকিৎসা করতেন। তিনি আত্ম‑তাবারা মডেল হাসপাতালের রোগী ও কর্মচারীদের সামনে এমবিবিএস, এমসিপিএস (মেডিসিন) ও এফসিপিএস (নিউরো‑মেডিসিন) ডিগ্রি উল্লেখ করে মস্তিষ্ক, স্ট্রোক, প্যারালাইসিস ইত্যাদি জটিল রোগের চিকিৎসা করার দাবি করতেন।
প্রতারণার ভিত্তি ছিল নুরুলের নিজস্ব নামের সঙ্গে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) এর একটি নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করা। তিনি এই নম্বরটি ব্যবহার করে নিজেকে নিউরো‑মেডিসিনের বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতেন এবং হাসপাতালের চেম্বার ও সাইনবোর্ডে উপরে উল্লেখিত ডিগ্রি ও বিশেষত্বের তালিকা প্রদর্শন করতেন। তবে তদন্তে প্রকাশ পায় যে তিনি কোনো স্বীকৃত মেডিকেল ডিগ্রি অর্জন করেননি এবং বিএমডিসি‑এর নিবন্ধনও ভুয়া।
আত‑তাবারা মডেল হাসপাতাল, যা ভবানীগঞ্জ পৌরসভার গুদাম মোড়ে অবস্থিত, নুরুলের এই ভুয়া পরিচয় বহু বছর ধরে চলছিল। তিনি সেখানে চেম্বার চালাতেন এবং রোগীদের কাছে মস্তিষ্ক‑সংক্রান্ত রোগের চিকিৎসা প্রদান করার দাবি করতেন। সাইনবোর্ডে তার নামের পাশে এমবিবিএস, এমসিপিএস ও এফসিপিএস উল্লেখ থাকলেও সব তথ্যই মিথ্যা প্রমাণিত হয়। এছাড়া তিনি কিশোরগঞ্জের জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরো‑মেডিসিন বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতেন, যা কোনো প্রমাণ ছাড়া ছিল।
১১ জানুয়ারি ২০২৪ রবিবার, ভ্রাম্যমাণ আদালত আত‑তাবারা মডেল হাসপাতালের সামনে অভিযান চালায়। অভিযুক্ত নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রোসিকিউশন দাখিল করেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সাফিউল্লাহ নেওয়াজ। আদালতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইফুল ইসলাম ভূঁঞা নুরুলের ওপর ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং দশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড আরোপ করেন।
দণ্ডের পাশাপাশি, আত‑তাবারা মডেল হাসপাতালের মালিক মশিউর রহমানের ওপর দুই লাখ টাকা জরিমানা আরোপ করা হয়। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯‑এর ধারা ৫২ অনুসারে, ভুয়া চিকিৎসক নিয়োগ এবং রোগীর জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলার জন্য এই জরিমানা দেওয়া হয়।
প্রতিবাদী নুরুলের অপরাধমূলক কার্যকলাপের প্রমাণ হিসেবে আদালতে বিএমডিসি নিবন্ধন নম্বরের নকল ব্যবহার, মিথ্যা ডিগ্রি ও বিশেষত্বের তালিকা, এবং রোগীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অর্থের রেকর্ড উপস্থাপন করা হয়। তদন্তে দেখা যায় যে নুরুলের এই প্রতারণা শুধুমাত্র আত‑তাবারা মডেল হাসপাতালের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পার্শ্ববর্তী নওগাঁর আত্রাই উপজেলার সেও রোগীকে সেবা দিতেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তিনি সেখানেও একই রকম ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে চিকিৎসা করতেন।
বিএমডিসি এখন নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাবদ্ধ ব্যবস্থা গ্রহণের সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে। মেডিকেল কাউন্সিলের দায়িত্ব হল ভুয়া ডাক্তারের নিবন্ধন বাতিল করা এবং ভবিষ্যতে এমন প্রতারণা রোধে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা। এছাড়া, রোগী ও পরিবারকে সচেতন করতে স্বাস্থ্য বিভাগে তথ্য প্রচার চালু করা হয়েছে।
মোবাইল আদালতের রায় চূড়ান্ত না হলেও, নুরুলের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ রয়েছে। যদি আপিল করা হয়, তবে জেলা আদালতে মামলাটি পুনর্বিবেচনা করা হবে। একই সঙ্গে, স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তদারকি বাড়িয়ে রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অতিরিক্ত পরিদর্শন পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এই ঘটনা রোগী ও তাদের পরিবারকে ভুয়া চিকিৎসকের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছে এবং স্বাস্থ্যসেবা ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নিয়ম মেনে চলার গুরুত্ব পুনরায় তুলে ধরেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রতারণা রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ত্বরিত পদক্ষেপ প্রত্যাশিত।



