জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) আগামীকাল নির্ধারিত সভায় সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদিত হতে পারে, যেখানে দেশের শীর্ষ দশটি অবকাঠামো প্রকল্পের মোট বরাদ্দে ১২০০০ কোটি টাকার বেশি হ্রাসের প্রস্তাব রয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাজেট অপরিবর্তিত থাকলেও, ঢাকা‑আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে; বাকি আটটি প্রকল্পের তহবিল কমানো হবে।
এই কাটছাঁটের পেছনে মূল কারণ হল প্রকল্প বাস্তবায়নের হার প্রত্যাশিত স্তরে না পৌঁছানো এবং সরকারের রাজস্ব সংগ্রহের অবনতি। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বছরের শুরুর দিকে বরাদ্দ করা তহবিলের বেশিরভাগই সময়মতো ব্যবহার করা সম্ভব হয় না, ফলে এডিপি থেকে অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দিতে হচ্ছে।
সংশোধিত এডিপিতে উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে মেট্রোরেল (এমআরটি‑১) প্রকল্পের বাজেট। পূর্বে ৮৬৩১ কোটি টাকার বরাদ্দ থাকা এই রেললাইনটি এখন মাত্র ৮০১ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হবে, ফলে ৭৮৩০ কোটি টাকার কাছাকাছি, অর্থাৎ প্রায় ৯১ শতাংশ তহবিল হ্রাস পাবে। এই রেললাইনটি কামালাপুর থেকে রামপুরা, মতিজিল, পূর্বাচল এবং নতুনবাজার পর্যন্ত বিস্তৃত, যা শহরের যাতায়াতের গতি বাড়ানোর লক্ষ্য রাখে।
মেট্রোরেল (এমআরটি‑৫) প্রকল্পের ক্ষেত্রেও বরাদ্দে সমন্বয় করা হয়েছে। পূর্বে ১,৪৯০ কোটি টাকার অনুমোদিত তহবিল এখন কমিয়ে নির্দিষ্ট পরিমাণে পুনর্বিন্যাস করা হবে, যদিও সুনির্দিষ্ট নতুন পরিমাণ প্রকাশিত হয়নি। একই সঙ্গে, উত্তরা‑মিরপুর‑কমলাপুর রুটের সম্প্রসারণ কাজ চলমান, যেখানে মতিজিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের কাজ চলছে।
মেট্রোরেল (এমআরটি‑৬) এবং মেট্রোরেল (এমআরটি‑১) উত্তরাংশের জন্যও তহবিল হ্রাসের পরিকল্পনা রয়েছে, যদিও সুনির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। এই দুই রেললাইন দেশের দ্রুতগামী নগর পরিবহন নেটওয়ার্কের অংশ, তবে বাস্তবায়নের ধীরগতি ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা বাজেটের পুনর্বিবেচনার দিকে ধাবিত করেছে।
সড়ক প্রকল্পের ক্ষেত্রেও সমন্বয় করা হয়েছে। সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল থেকে রংপুর পর্যন্ত চার লেন সড়ক নির্মাণের জন্য বরাদ্দ কমানো হবে, পাশাপাশি ঢাকা‑সিলেট সংযোগকারী চার লেন সড়কের তহবিলেও কাটছাঁটের সম্ভাবনা রয়েছে। এই সড়কগুলো দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের বাণিজ্যিক সংযোগ বাড়ানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তবে বাস্তবায়নের অগ্রগতি ধীর হওয়ায় বাজেটের পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।
মাতারবাড়ি বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের তহবিলেও হ্রাসের কথা বলা হয়েছে। বন্দরটি দেশের বাণিজ্যিক লজিস্টিক্সের মূল কেন্দ্র হিসেবে পরিকল্পিত, তবে প্রকল্পের অগ্রগতি ও আর্থিক চ্যালেঞ্জের কারণে এডিপিতে বরাদ্দ কমানো হবে।
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ এবং বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বিআরটি (ব্রিজড র্যাপিড ট্রান্সপোর্ট) প্রকল্পের তহবিলও হ্রাস পাবে। এই দুই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হল দেশের বিমান পরিবহন ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ঢাকা-গাজীপুর রুটে দ্রুতগামী রেল সেবা চালু করা, তবে আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবায়নের ধীরগতি এই পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করেছে।
এডিপি সংশোধনের অনুমোদন পেতে এনইসি সভায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সভাপতিত্ব করবেন। সভায় সংশোধিত বাজেটের বিবরণ উপস্থাপন করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে নতুন বরাদ্দের ভিত্তিতে প্রকল্পের অগ্রগতি পুনর্মূল্যায়ন করতে বলা হবে।
বড় প্রকল্পের তহবিল হ্রাসের ফলে বাজারে কিছু প্রভাব প্রত্যাশিত। নির্মাণ সংস্থার অর্ডার কমে যাওয়া, সরবরাহকারী ও শ্রমিকের চাহিদা হ্রাস এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পের আয়তনে সাময়িক সঙ্কোচন দেখা দিতে পারে। তবে একই সঙ্গে, সরকার বাজেটের ঘাটতি কমাতে এবং রাজস্ব সংগ্রহের উন্নয়নে মনোযোগ বাড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, দীর্ঘমেয়াদে অবকাঠামো প্রকল্পের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তহবিলের স্বচ্ছতা ও বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো জরুরি। তহবিলের হ্রাসের ফলে প্রকল্পের সময়সূচি বিলম্বিত হতে পারে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
সারসংক্ষেপে, সংশোধিত এডিপি দেশের প্রধান অবকাঠামো প্রকল্পের তহবিলকে পুনর্গঠন করে, বাস্তবায়নের গতি ও আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাজেটের ভারসাম্য রক্ষা করার চেষ্টা করছে। আগামীকাল এনইসি সভায় এই পরিকল্পনা চূড়ান্ত রূপ পাবে, যা দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



